The story of Vapushtama, বপুষ্টমার গল্প

      


    বপুষ্টমা হলেন এক পৌরাণিক নারী  চরিত্র। তিনি  ছিলেন কাশীরাজ সুবর্ণবর্মার  কন্যা। সর্বাঙ্গসুন্দরী এই কন্যা একবার এক পুরুষের লালসার শিকার হয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতের পুরুষশাসিত সমাজ এই ঘটনাটি কিভাবে নিয়েছিল, তাই নিয়েই এই গল্প।গল্পটি হরিবংশ (বেদব্যাসের মহাভারতের একটি পরিশিষ্ট) থেকে নেওয়া।

                                                                                                    XXXXX 

    কুরুবংশের রাজা পরীক্ষিতের অকালমৃত্যু হওয়ার ফলে জন্মেজয়  খুব অল্প বয়েসে রাজা হয়েছিলেন। রাজকার্য প্রধানত চলতো মন্ত্রীপরিষদের দ্বারা। কিন্তু জন্মেজয়ও খুব অল্প বয়েসেই অনেক রাজকার্য শিখে গিয়েছিলেন। তাঁর ষোলো বছর বয়স হতে না হতেই মন্ত্রীরা তাঁর সাথে বিবাহযোগ্য পাত্রীর অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন।   

     জন্মেজয়ের মন্ত্রীরা কাশীরাজের কাছে গিয়ে জন্মেজয়ের সাথে বপুষ্টমার বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। কাশীরাজ প্রথমেই রাজি হননি । কিছুদিন পরে পাত্রের সম্বন্ধে সমস্ত রকম খোঁজখবর করে নিয়ে রাজি হলেন। আরো কিছুদিনের মধ্যেই বপুষ্টমার সাথে জন্মেজয়ের বিবাহ হয়ে গেলো ।   

    বপুষ্টমার মতো সর্বাঙ্গসুন্দরী স্ত্রী পেয়ে জন্মেজয়ের কিশোর মন তো আনন্দে আত্মহারা। কখনো জঙ্গলে, কখনো জলাশয়ে, কখনো ফুলে ভরা উপত্যকায় বছরভর ধরে তাঁদের মধুচন্দ্রিমা চলতে থাকলো। বপুষ্টমাও তাঁর স্বামীকে সর্বান্তকরণে ভালোবাসতেন। তিনিও তাঁর প্রত্যাশামত এমন এক স্বামীকে পেয়েছিলেন, যিনি তাঁর সৌন্দর্য ও গুনের একান্ত অনুরাগী। বহুদিন তাঁরা এক সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করলেন। জন্মেজয়ও  তাঁর স্ত্রীর প্রতি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন যে তিনি আর দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। 

    দিন সবার সমান যায়না। কেউ ভাবতে পারেনি, একসময় এই বপুষ্টমাকেই জনমেজয় ত্যাগ করতে চাইবেন, তাও বিনা দোষে, এবং এক তৃতীয় ব্যক্তির করা জঘন্য অপরাধের জন্য।  

                                                                                                    XXXXX 

    সর্পযজ্ঞ সবে শেষ হয়েছে। বেদব্যাসের উপস্থিতিতে বৈশম্পায়ন ঋষির দ্বারা মহাভারত  মহাকাব্যের বর্ণনাও শেষ হয়েছে।যজ্ঞে উপস্থিত অন্যান্য সমস্ত রাজা ও মুনিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। সকলেরই মন প্লাবিত হয়ে রয়েছে এই  মহাকাব্যের ঘটনার কার্যকারণ ও ব্যাখ্যার  অনুসন্ধানে। কোনটা ধর্ম, কোনটা অধর্ম, কোনটা পাপ, কোনটা পুন্য, এইসব নিয়ে আলোচনাতেই সবাই মগ্ন। 

    স্বভাব অনুযায়ী এক যজ্ঞ শেষ হতে না হতেই জন্মেজয়ের  মাথায় চলে আসে আরেক যজ্ঞের চিন্তা। এবার তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু করলেন। পুরোহিত ও ব্রাহ্মণদের আবার ডাকা হলো।  

-"আমি এবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চাই।  আপনারা ঘোড়া ও অন্যন্য সামগ্রী জোগাড় করুন।"

    ব্রাহ্মণদের কাছে কোনো যজ্ঞ মানেই এক দান ধ্যানের মহোৎসব। আয়বৃদ্ধির এতো বড়ো আবার এক সুযোগ আসাতে  সবাই খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লেন। 

    কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস তখনও নিজের আশ্রম অভিমুখে যাত্রা শুরু করেননি। জন্মেজয় আবার অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শুনে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন। আবার যুদ্ধ ? আবার এক হত্যালীলা ? ব্যস্ত হয়ে আবার তিনি জন্মেজয়ের কাছে উপস্থিত হলেন। 

    বেদব্যাস প্রথমেই  কিছু না বললেও জন্মেজয় বোধ হয় তাঁর  উদ্দেশ্য কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। এইজন্য তিনি তাঁর লেখা মহাভারতের খুব প্রশংসা শুরু করলেন। এটি শুনে তাঁর নাকি অনেক জ্ঞান লাভ হয়েছে। এরপর তিনি নিজেই বলতে শুরু করলেন, 

    "হে মহাত্মা, আমার মনে হয় এতো বড়ো যে যুদ্ধ হলো তার পিছনে একটাই কারণ ছিল, যুধিষ্ঠিরের করা রাজসূয় যজ্ঞ। কোনো রাজা এইধরণের কোনো যজ্ঞ করলেই অন্য রাজাদের সাথে যত হিংসা ও বৈরীতার সৃষ্টি হয়, ফলে শুরু হয় যত যুদ্ধ। ইতিহাসে আমরা দেখেছি এর আগে অন্যান্য যত যুদ্ধ হয়েছে, সবকিছুর পিছনে ছিল কোনো রাজার করা রাজসূয়  বা অশ্বমেধ যজ্ঞ। আপনি তো সেই সময়ে সেখানে ছিলেন, আপনি যুধিষ্ঠির কে ওই যজ্ঞ বন্ধ করতে কেন বলেননি ?"

    জন্মেজয়ের মুখে এই কথা শুনে বেদব্যাস একটু আশ্চর্যই হলেন। যা তিনি বলতে এসেছিলেন, সেই কথাই  জন্মেজয়  নিজে বলছেন। তাও তিনি বললেন,

    "হে পুত্র, তোমার প্রপিতামহের ভাগ্য এইভাবেই নির্ধারিত ছিল।  ভবিতব্যকে কেউ আটকাতে পারেনা। ওই সময়ে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি, এইজন্য আমি কাউকে বাধা দিইনি। বাধা দিলেও সে নিশ্চই শুনতো না।  আজকে আমি যদি তোমাকে এই অশ্বমেধ যজ্ঞ বন্ধ করতে বলি , তুমি কি শুনবে ? তোমার পৌরুষ তোমাকে বাধ্য করবে আমার কথা অমান্য করতে। 

    যাইহোক তুমি যখন জিজ্ঞেস করেছো, তাই বলছি, এই যজ্ঞ করা থেকে বিরত হও। আমি  সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত  বর্তমান দেবরাজ  বাসব কে নিয়ে। দেবতাদের এই ইন্দ্র অনেক ক্ষমতাশালী হলেও এখন ভারতে তাঁর প্রভাব ক্রমহ্রাসমান। এইজন্য অন্য কোনো রাজা যাতে ইন্দ্রের থেকে প্রভাবশালী না হন, তা  নিশ্চিত করার জন্য তিনি অনেক নীচ কার্য করতেও দ্বিধা করবেননা।" 

    (প্রসঙ্গত বলে  রাখি, দেবতাদের রাজাকে ইন্দ্র বলে অভিহিত করা হতো।  এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। বাসবের আগেও অনেক ইন্দ্র ছিলেন।) 

    জন্মেজয় শুনলেন, কিন্তু এই নিয়ে আর বেশি আলোচনা করলেননা। বেদব্যাস দূরদর্শী মানুষ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এরপর কি হতে পারে। তিনি এবার প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে ভবিষ্যৎ যুগের পরিস্থিতি নিয়ে কিছু আলোচনা করে বিদায় নিলেন।                                             

    অবশেষে ভবিতব্যই সত্যি হলো। কিছুদিন পরেই শুরু হলো অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি। প্রচুর দানধ্যানের আয়োজন করা হলো।  একটি তরতাজা ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হলো বিভিন্ন রাজ্যজয় করার জন্য। আশানুরূপ ভাবেই পুরো ঘটনাটি দেবরাজ বাসবেরও নজরে এলো। 

                                                                                                    XXXXX 

    অশ্বমেধের ঘোড়া ফিরে এলো । তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী ঘোড়াটিকে বলি দেওয়া হলো।  এরপর প্রধান পুরোহিত মৃত ঘোড়াটির সাথে কিছু অনুষ্ঠান করলেন এবং রানী বপুষ্টমাকে নির্দেশ দিলেন মৃত ঘোড়াটির সাথে একটি রাতযাপন করার জন্য। রীতি অনুযায়ী ওই সময়ে ওই ঘরে অন্য কেউ থাকতে পারবেননা। রানীর সহচরীরাও নয়। 

    বাসব এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। যজ্ঞ পন্ড করার এবং নিজের ভোগলালসা চরিতার্থ করার এমন সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চাইলেননা।  গভীর রাতে তিনি ওই ঘরে প্রবেশ করলেন। মৃত ঘোড়াটিকে সরিয়ে দিয়ে বপুষ্টমাকে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ করলেন। অসহায় বপুষ্টমার কিছু করার ছিলোনা। ওই ঘর থেকে রাজপ্রাসাদ অনেকটাই  দূরে, এবং আশেপাশে কোনো প্রহরীও ছিলোনা। 

    সকাল বেলা সবকিছু জানাজানি হলো। জন্মেজয়ের রাগের কোনো সীমা পরিসীমা রইলোনা । কিন্তু অত্যন্ত ক্ষমতাশালী দেবরাজকে শাপ দেওয়া ছাড়া তিনি আর কিছুই করতে পারলেননা । উপস্থিত ব্রাহ্মণদেরকেও তিনি অপমান করে নিজের রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু এরপরে তিনি যা করলেন  তারজন্য কেউই  প্রস্তুত ছিলোনা। রানীর সহচরী এবং অন্যান্য অন্তঃপুরবাসী মহিলাদের তিনি ডেকে পাঠালেন। সবার সামনে বলে উঠলেন, 

    "বপুষ্টমা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাকে এই মুহূর্তে আমার ঘর থেকে বহিষ্কার করো। সে আমার অপমান করেছে। সে আমার সমস্ত পুণ্যকে ধ্বংস করেছে। আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম সে আজ আমার সমস্ত খ্যাতি ও সন্মান কে ধূলিস্যাৎ করে দিলো। যে ব্যক্তির স্ত্রীকে অন্য ব্যক্তি ধর্ষণ করে, সেই ব্যক্তির জীবন দুর্বিসহ হয়ে যায়। সে না ভালোভাবে খেতে পারে, না ভালোভাবে শুতে পারে। "

     উপস্থিত সবাই এই কথা শুনে অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। এই তথাকথিত ধার্মিক রাজা কি কথা বলছেন ? তিনি শুধুমাত্র নিজের কথা বলে যাচ্ছেন।  তাঁর এতো প্রিয় রানীর সাথে এতবড়ো জঘন্য অপরাধ হওয়ার পর, রানীর  জন্য তাঁর  কোনো সহানুভূতিই নেই ! সবার সামনে তিনি নিজের রানীর ওপর কলঙ্কারোপ করে চলেছেন ! এতদিন ধরে মহাভারতের গল্প, গীতা শুনে তাঁর মনের কি কোনো পরিবর্তন হয়নি ? ইনি কি এখনো বুঝতে পারেননি কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম ? কৌরবরা দ্রৌপদীর অপমান করার পরে পাণ্ডবরা কি দ্রৌপদীকেই  দোষী প্রতিপন্ন করে পরিত্যাগ করেছিলেন ? 

    গন্ধর্বরাজ বিশ্ববসু আর থাকতে পারলেননা। বলে উঠলেন ,

    " হে মহারাজ, এসব আপনি কি বলছেন ? তিনশত যজ্ঞ করে আপনি ভাবছেন আপনি বাসবের  থেকেও ক্ষমতাশালী  হয়ে গেছেন ? বাসবের বুদ্ধি, তার ধীশক্তি সাধারণের থেকে অনেক বেশি।  সে আপনার বদনাম করার জন্য আপনার যজ্ঞ পন্ড করার চেষ্টা করেছে । তার এই চেষ্টা সফল করার জন্য এখন আপনি অনবগত ভাবে সহায়তা করছেন। তিনশত যজ্ঞ করার জন্য যেসব শুভাকাঙ্খী মানুষ আপনাকে এতদিন সাহায্য  করে এসেছে, তাদেরকে এক কথায় অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন। এখন আপনি আপনার এমন অসাধারণ গুণবতী রানী বপুষ্টমার ওপর কলঙ্কারোপ করছেন । এমন রত্নের মতো নারীকে আপনি অপমান করছেন। এতে বাসবের উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হবে। 

    বাসব বপুষ্টমার জন্য অনেক  আগে থেকেই কামনা পোষণ করতেন। তিনি  বপুষ্টমার বিষয়ে রাজ্যে কি প্রচার করেছেন তা কি আপনি জানেননা ? বপুষ্টমা নাকি পূর্বজন্মে অপ্সরা রম্ভা ছিলেন। রম্ভার উপর তৎকালীন ইন্দ্রের যত অধিকার ছিল, ততটাই অধিকার নাকি বপুষ্টমার উপর বাসবের আছে। এসব জানা সত্বেও আপনি এই যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। আপনার ভবিতব্যই আপনাকে এই সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

    বপুষ্টমাকে দোষ দেবেননা। এমন রত্নসদৃশ স্ত্রীকে কোনো কলঙ্ক স্পর্শ করতে পারেনা। এই দুর্ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত করুন। যে স্ত্রী কোনো পাপ করেননি, তাকে যদি আপনি বহিষ্কৃত  করেন, তাহলে আপনিই  শাপিত  হবেন। সূর্য বা অগ্নির মতো ক্ষমতাশালী ব্যক্তি যদি নারীকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেন, তা কখনো সফল হয়না। শিক্ষিত ব্যক্তিরা এইরকম ঘটনা হলেও সেই নারীকে গ্রহণ করেন, পালন করেন এবং শ্রদ্ধা করেন। স্ত্রীদের শ্রদ্ধা এবং সন্মান দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তাঁরা ঘরের লক্ষীসদৃশ। তাঁদের জন্য ঘরের সম্পদ ও সমৃদ্ধি বাড়ে। "

    গন্ধর্বরাজ বিশ্ববসুর এতরকম ভাবে বোঝাবার ফলে অবশেষে জন্মেজয়ের নিজের ভুলের অনুভূতি হলো। রাগের মাথায় তিনি যে আরো এক অপরাধ করতে যাচ্ছিলেন, তা বুঝতে পারলেন। এরপর বপুষ্টমাকে যোগ্য সম্মানের সাথে তিনি গ্রহণ করলেন এবং বহুদিন সুখে রাজত্ব করলেন। 

Comments

  1. Well , you have established a genre for yourself and it's doing fine. Keep it up. Best wishes

    ReplyDelete
  2. খুব সুন্দর হয়েছে। লিখতে থাক।অনেক শুভকামনা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

The story of Ganga

A Management and political lesson from the Ramayana

The revenge - প্রতিশোধ