The revenge - প্রতিশোধ
ইক্ষুমতি বা অক্ষু নদীর ধারে পাশাপাশি দুতিনটি অস্থায়ী গ্রাম। বেশিরভাগ ঘর মাটির, ওপরে পাতার ছাউনি দেওয়া । এছাড়াও লতাপাতা আর কাঠ দিয়ে তৈরী কিছু ঘরও রয়েছে। ঘরগুলি দেখেই বোঝা যায় অস্থায়ী ভাবে থাকার জন্য তৈরী। এখানেই একটি গ্রামে থাকে পাঁচ বছরের একটি ছোট্ট ছেলে, নাম তক্ষক। তক্ষকের মা কদ্রু, আর বাবা কশ্যপ মুনি। তক্ষক তার বাবাকে কখনো দেখেনি। তার ঘরে মা আছে আর অনেক ভাইবোন আছে। ঘরের সমস্ত কিছু মা সামলায়। বাবা নাকি জঙ্গলে সাধন ভজন নিয়েই থাকে। তক্ষকের জন্ম এই গ্রামেই, কিন্তু সে শুনেছে তার মা এখানে এসেছে অন্য একটি জায়গা থেকে, আরো অনেকের সাথে। সেখানে কোনো নদী ছিলোনা। ছিল একটি বিশাল হ্রদ । তক্ষক শুনেছে কিছুদিন পরে তারা এখান থেকেও আবার চলে যাবে।
"মা আমরা বারবার এইরকম জায়গা পরিবর্তন করি কেন ?"
তক্ষক জিজ্ঞাসা করেছিল।
"আমরা একজায়গায় বেশিদিন থাকতে পারিনা রে, আমাদের পোষা জানোয়ারগুলো খেতে পাবেনা। ওদের চরাবার জমিগুলোতে ঘাস পাতা শেষ হয়ে যায়। আবার বর্ষাকালে নতুন করে হয়। ততদিন ওরা খাবে কি ? এছাড়া আমাদের একজায়গায় বেশিদিন থাকতেও ভালো লাগেনা।"
"তাহলে ওই পাশের গ্রামের লোকেরাও কি আমাদের সাথে আবার অন্য জায়গায় যাবে?"
"হ্যাঁ বাবা, ওরা অন্য জাতের লোক হলেও, আমরা একসাথেই থাকি আর জায়গা পরিবর্তন করি।"
তক্ষকরা হলো সাপের উপাসক। নিজেদের কে তারা অনেক সময় নাগ বা সাপের বংশের বলে পরিচয় দেয়।তক্ষকের গ্রামের লোকেরা সবাই বড়ো বড়ো ওঝা আর গুনীন। ঘরেই নানারকম সাপ পুষে রাখে । ওই সাপগুলোর বিষ থেকে তারা নানারকম ওষুধ তৈরী করে। এছাড়া জঙ্গল থেকেও তারা নানা রকম জড়িবুটি সংগ্রহ করে।
নাগেদের গ্রামের পাশেই রয়েছে সুপর্ণদের আর আর্যদের গ্রাম। সুপর্ণরা আবার বাজপাখির পুজো করে। নাগেদের মতো সুপর্ণরাও বলে তারা নাকি বাজপাখির বংশ।এরা শিকার করতে খুব ভালোবাসে। সেটাই তাদের প্রধান জীবিকা। আর্যরা পুজো করে আগুনের।আর্যদের মধ্যে একটি নেতৃস্থানীয় গোষ্ঠী আছে, যারা নিজেদেরকে দেবতা বলে। এখানকার উপজাতিগুলি আবার দেবতাদেরকে প্রায় ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করে। দেবতাদের বুদ্ধি আর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা অসাধারন। অক্ষু নদীর ধারের সমস্ত উপজাতিগুলি এদের নির্দেশ মেনে চলে।
তিনটি গ্রামের বাচ্চারাই একসাথে খেলাধুলা করে, কিন্তু নাগেদের সাথে অন্য জাতের বাচ্চাদের বিশেষ বনিবনা নেই। সবাই বলে সাপেদের সাথে থাকতে থাকতে নাগেদের স্বভাব নাকি সাপেদের মতো ক্রূর আর নিষ্ঠূর হয়ে গেছে। কথাটা অবশ্য একদম মিথ্যেও নয়। নাগেরা যেমন চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী, তেমনই হত্যা করার বিদ্যেতেও পারদর্শী। যুদ্ধ করার থেকে গুপ্তহত্যা করে কাজ হাসিল করতেই এরা সিদ্ধহস্ত । ঘরের মধ্যে বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দিয়ে, বিষ খাইয়ে বা বিষ মাখানো তীর দিয়ে মেরে এরা হত্যা করে।
কিছুদিন আগেই তক্ষকের সাথে সুপর্ণদের গ্রামের গরুড় এর খুব ঝগড়া হয়ে গেলো । গরুড় তক্ষকের প্রায় সমবয়েসী। গরুড় বলেছিলো,
"তোদের সমস্ত নাগেদেরকে আমরা খেয়ে নিতে পারি, জানিস ? আমরা হলাম গিয়ে বাজপাখির বংশ, আমরা সাপেদেরকে খেয়ে ফেলি।"
আর যায় কোথা , নাগ আর সুপর্ণদের গ্রামের ছেলেদের মধ্যে ঝগড়া মারপিট শুরু হয়ে গেলো। আর্যদের বাচ্চারা কেউ তক্ষকের আর কেউ গরুড়ের পক্ষ নিলো। কিন্তু সুপর্ণদের বাচ্চারা মারামারিতে সিদ্ধহস্ত। কিছুক্ষন পরেই তক্ষক মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চললো মাকে নালিশ করতে।
একটু পরেই গোটা গ্রাম জুড়ে শোনা যেতে লাগলো কদ্রুর তারস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি আর শাপ শাপান্ত। সুপর্ণদের গ্রামের সামনে গিয়ে চেঁচামেচিটা বিশেষ করে গরুড়ের মা বিনতার উদ্দেশ্যে। রাগের অন্য কারনও অবশ্য আছে। বিনতা হলো কশ্যপ মুনির আরেক স্ত্রী। সে আবার একটু নম্র স্বভাবের, কদ্রুর মতো মুখরা নয়। কশ্যপ মুনি জঙ্গলে থাকলেও মাঝে মাঝে বিনতার কাছে আসেন, সন্তানরাও তাঁকে ভালো করে চেনে, কিন্তু তিনি কদ্রুর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখেননা। বিনতাও অবশ্য কম যায় না। সেও চেষ্টা করে কি করে কদ্রুকে অপদস্থ করা যায়। কদ্রু রেগে গিয়ে ঝগড়া শুরু করলে বিনতা হাসে, আর সবাইকে ডেকে এনে দেখায়।গ্রামের সবার কাছে কদ্রু আর বিনতার ঝগড়া একটা নিত্যদিনের গা সওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে। কখনো কখনো অবশ্য দুজনের খুব ভাবও দেখা যায়, কিন্তু সেটা কতটা সত্যিকারের তা বোঝা খুব মুশকিল।
একদিন সাতসকালে গ্রামে কদ্রুর চিৎকার চেঁচামেচি, শাপ শাপান্ত শোনা গেলো,
"মরবি, মরবি তোরা, ঝাড়ে বংশে তোরা ধ্বংস হবি। তোরা মায়ের কথা শুনবিনা না ? দেখ তোদের কি হয়, কেউ তোদের বাঁচাতে আসবেনা। তোদেরকে অন্য জাতের লোকেরা আগুনে পুড়িয়ে মারবে।"
যদিও গ্রামের মধ্যে কদ্রুর শাপশাপান্ত রোজই শোনা যায়, তবুও আজকে যেন গ্রামসুদ্ধ সবাই তটস্থ হয়ে গেলো । কারন সে আজ সে পাশের বাড়ির লোকেদেরকে শাপ দিচ্ছেনা, বিনতা বা তার ছেলেদেরকেও শাপ দিচ্ছেনা , নিজের ছেলেদেরকে শাপ দিচ্ছে।
আর্যদের প্রধান দেবতা ব্রহ্মা খোঁজ নিতে এলেন, কি ব্যাপার। ব্যাপার আর কিছুই নয়, কিছুদিন আগে আর্যদের একটি অত্যন্ত সুন্দর ঘোড়া দূর থেকে দেখা গেছিলো। ওই ঘোড়ার লেজের রং নিয়ে কশ্যপ মুনির দুই স্ত্রী বাজি রেখেছিলেন। বিনতা বলেন সাদা, আর কদ্রু বলেন কালো। একজন হেরে গেলে অন্যজনের দাসী হয়ে থাকবেন। কদ্রু ভালোভাবেই জানতেন যে বিনতাই ঠিক বলছেন, কিন্তু তিনি বিনতাকে দাসী বানাবার সুযোগ ছাড়তে রাজি নন । তিনি তাঁর ছেলেদেরকে বলেছিলেন,
"কালকে আমরা দুজনে ওই ঘোড়াটাকে কাছ থেকে দেখতে যাবো। তোরা গিয়ে ওই ঘোড়ার লেজকে কালো রং করে দে, যাতে আমি বাজি জিতি।"
কিন্তু ছেলেরা রাজি হয়নি। তারই ফল এই শাপ শাপান্ত !
ব্রহ্মা তাদেরকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোনোমতে শান্ত করলেন, কিন্তু মনে মনে খুব খুশি হলেন। নাগেদের মধ্যে কিছু ভালো ব্যক্তি থাকলেও বাকিদেরকে আর্যরা অত্যন্ত অপছন্দ করে । বেশিরভাগ নাগ, বিশেষ করে কদ্রুর সন্তানরা অত্যন্ত অসৎ ও নিষ্ঠূর স্বভাবের। হত্যা, চুরি, ছল চাতুরী করে নিজেদের কার্যসিদ্ধ করতে এরা একেবারেই পিছপা হয়না। আর কদ্রুর অভিশাপও একদম অবাস্তব নয়। উপজাতিগুলি মাঝে মাঝেই নানারকম ঝগড়া, যুদ্ধ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। তখন এক উপজাতি অন্য উপজাতির গ্রামে আগুন লাগিয়ে মানুষ শুদ্ধ পুরো গ্রামটাকে ধ্বংস করে দিতে দ্বিধাবোধ করেনা ।
এই ঘটনার কয়েক মাস পরে আবার সবাই চলতে শুরু করলো সবুজ ঘাসজমির সন্ধানে। জিনিসপত্র বোঝাই গরুর গাড়ি, ঘোড়ায় টানা রথ, পিঠে বোঝা চাপানো খচ্চর, ছাগল ইত্যাদি নিয়ে সে এক লম্বা মিছিল। তক্ষকও চললো তার মা আর দাদাদের সাথে। গ্রাম যেমন কে তেমন পড়ে রইলো। আবার এখানে ফিরে এলে এই গ্রামটাকেই আবার ঠিকঠাক করে নেওয়া যাবে। অবশ্য এদের গন্তব্যস্থান মোটামুটি ঠিক করাই আছে । অনেক আগে এদের পূর্বপুরুষেরা দক্ষিণ পূর্বদিকে সরস্বতী নদীর ধারে উপস্থিত হতো । কিন্তু তারপর হিমালয়ে এক বড়োসড়ো ভূস্খলনের ফলে সরস্বতী নদীর জলের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আরো পূর্বদিকে অন্যান্য নদীর আশেপাশে তারা উপস্থিত হয় ।
বিগত কিছু বছর ধরে আবার একটা নতুন ব্যাপার শুরু হয়েছে । যতজন এখানে আসে, সবাই আগের জায়গায় আর ফিরে যায়না । এই উপজাতিগুলির, বিশেষকরে আর্যদের পূর্বপুরুষরা অনেকেই এইসব এলাকায় স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছে। তক্ষক আর গরুড়দের আত্মীয়স্বজনরাও অনেকেই হিমালয়ের দক্ষিণদিকের নদীগুলির আশেপাশে অনেকদিন ধরে বসবাস করছে। অনেকেই এখানকার স্থানীয় অসুর উপজাতির লোকেদের কাছ থেকে শিখে গেছে, কেমন করে বীজ পুঁতে কিছু বিশেষ ধরণের গাছ তৈরী করা যায়, আর সেই গাছের শস্য থেকে নানারকম খাবার বানানো যায়। একটা জমিকেই বারবার ব্যবহার করে যদি খাবারের সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহলে স্থানপরিবর্তন করার দরকার কি ? ফলে কোথাও যুদ্ধ জিতে, কোথাও বা বৈবাহিক সম্বন্ধের মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতিদের সাথে মিশে এরা স্থায়ী বাসস্থান তৈরী করে ফেলেছে । আর্যদের নেতৃস্থানীয় গোষ্ঠীটি আবার হিমালয়ের একটু উপরের দিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি জনপদের স্থাপনা করেছে। জাতের শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য কোনো স্থানীয় জাতির সাথে এরা মেশেনি । এরা হলো তৎকালীন আর্যাবর্তের সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতি, দেবতা। তাদের জনপদের নাম হলো দেবলোক।
XXXXXX
কদ্রুর অভিশাপ দেওয়ার পর অনেক দিন চলে গেছে। কদ্রুর সন্তান এবং অন্যান্য নাগেরাও আর্যাবর্তের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে ।
তক্ষক তার স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে এখন থাকে খাণ্ডবপ্রস্থে। একটু জঙ্গুলে জায়গা, তবু তক্ষকের এই জায়গাই বেশি পছন্দ। তক্ষকের ইচ্ছে, সেও একটি নতুন জনপদের স্থাপনা করবে । খাণ্ডবপ্রস্থেই তার পরিচয় হয়েছে দানব উপজাতির ময়দানব এর সাথে। সে দেখেছে অসুর আর দানবরা মাটি পুড়িয়ে চারকোনা আকারের কৃত্রিম পাথর তৈরী করে, আর তার থেকে খুব সুন্দর বাড়ি তৈরী করতে পারে । মাটি পুড়িয়ে এতো সুন্দর ঘর বানাবার সামগ্রী বানানো যায়, এই ধারণাটাই তক্ষকের ছিলোনা।। তক্ষকের ইচ্ছা, সেও ঐরকম চারকোনা কৃত্রিম পাথর দিয়ে তৈরী করবে একটি নগর, যার রাজা হবে সে নিজে।
দেবতাদের বর্তমান রাজা ইন্দ্র । তাঁর সাথে তক্ষকের খুব বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের থেকে বেশি বলা যায় পারস্পরিক বোঝাপড়া। ইন্দ্র চান তক্ষকের সৎ ভাই, গরুড় যেন কখনো ক্ষমতাশালী না হয়ে ওঠে । গরুড় খুব বড়ো বীর যোদ্ধা। তার মধ্যে ইন্দ্র নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখতে পান। তাঁর ভয়, এই বুঝি সে তাঁকে পরাজিত করে দেবতাদের রাজা হয়ে যায়, আর সুপর্ণরা দেবতাদের থেকে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে ।
কদ্রুর অন্য সন্তানদের মধ্যে বাসুকি, শেষনাগ এদের সাথে দেবতাদের খুব ভালো সম্পর্ক । বাসুকিও অবশ্য দেবতাদেরকে তাদের "সাগর মন্থন" প্রকল্পে যুদ্ধের সময়কালীন আঘাতের থেকে বেঁচে ওঠার বিভিন্ন রকম ওষুধের সন্ধান দিয়ে মৃত্যুভয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে বাসুকির সুযোগ্য নেতৃত্বে নাগ জাতি এই আর্যাবর্তের রাজনীতিতে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। বাসুকি নিজে গঙ্গার ধরে একটি জনপদ স্থাপন করেছেন। অন্যান্য নাগেরাও অনেক জনপদ স্থাপন করেছে, কিন্তু সাথে সাথে শুরু হয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যে ও আর্যদের সাথে রাজনৈতিক সংঘাত।বাসুকি কিন্তু সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন আর্যদের সাথে বৈবাহিক ও কূটনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করে এই সংঘাতকে প্রশমিত করার।
XXXXXX
আর্যাবর্তের উত্তরপশ্চিম দিকের একটি রাজ্য বা জনপদ হলো কুরু। এই অঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে কুরুবংশ একটু বিশিষ্ট। অত্যন্ত সন্মানীয় এই বংশের রাজারা ন্যায়, নীতি ধর্ম পালনে ও পরাক্রমে অন্য সমস্ত জনপদগুলির সমীহ আদায় করে নিয়েছে। এই বংশেরই এক রাজা ভরতের নামে আজকাল আর্যাবর্তকে ভারতবর্ষ বলা হয়। এই রাজ্যের রাজধানী হচ্ছে হস্তিনাপুর। বর্তমান রাজা ধৃতরাষ্ট্র হলেও, তিনি অন্ধ হওয়ার কারনে রাজ্যের প্রকৃত পরিচালক হলেন তাঁর জ্যাঠামশাই ভীষ্ম। ধৃতরাষ্ট্রের ভাই পাণ্ডুর অকালমৃত্যু হওয়ার ফলে ধৃতরাষ্ট্রর ছেলেদের সাথে সাথে পাণ্ডুর সন্তানদেরকেও শিক্ষা দীক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন ভীষ্ম। সমস্যা একটাই, দুই ভাইয়ের সন্তানদের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভাব ভালোবাসা নেই। ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা ,যারা কৌরব নামে পরিচিত, তারা সংখ্যায় বেশি হওয়ায় পাণ্ডুর ছেলেদের বা পাণ্ডবদের ওপরেই বেশি অত্যাচার হয় । পাণ্ডবদের এক ভাই, ভীমও অবশ্য কিছু কম যায়না। সে আবার কৌরবদের সবচেয়ে বড়ো ভাই দুর্যোধনকে নানা ভাবে নাস্তানাবুদ করে।
কুরু রাজ্যের থেকে নাগরাজ বাসুকির জনপদ, নাগলোক বেশি দূরে নয় । একদিন সকালে নাগরাজ বাসুকি রাজসভায় বসে আছেন । হঠাৎ কয়েকজন সৈনিক দৌড়াতে দৌড়াতে উপস্থিত হলো ।
"মহারাজ, মহারাজ, সর্বনাশ হয়ে গেছে।গঙ্গার ধরে এক বিশাল চেহারার মানুষ উপস্থিত হয়েছে, আর আমাদের লোকেদেরকে ধরে ধরে মারছে । আমাদের বিষ মাখানো তীর দিয়েও তাকে আমরা মারতে পারিনি। আমরা কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা।দয়া করে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখানে চলুন"
বাসুকি একটু আশ্চর্য হলেন। এটা কি করে সম্ভব ? নাগেদের বিষ মাখানো তীর দিয়েও মারা যায়না, এমন কোন মানুষ হতে পারে ? তিনি উপস্থিত হলেন গঙ্গার ধারে।কিন্তু পরিস্থিতি দেখে আর কিছু করতে পারলেননা। এ তো তাঁর দুর সম্পর্কের আত্মীয়, কুরুবংশের এক রানী, কুন্তীর মেজো ছেলে, ভীম। একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতেই জানা গেলো আসল ঘটনাটা।
কৌরব ও পাণ্ডবরা গতকাল গঙ্গার ধারের জঙ্গলে গেছিলো ফুর্তি করতে । সেখানে খাওয়ার সময় দুর্যোধন তাকে নিজের হাতে মিষ্টি খাওয়ায়। এরপরে ভীমের আর কিছু মনে নেই।
বাসুকি বুঝতে পারলেন ওই মিষ্টিতে বিষ মেশানো ছিল। ভীম অচৈতন্য হওয়ার পরে কৌরবরা তাকে নাগেদের এলাকায় ছেড়ে দিয়ে পালায়। এরপরে বাসুকির প্রহরীদের ছোঁড়া বিষাক্ত তীরের আঘাতে আগের বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়, ফলে ভীম সুস্থ হয়ে ওঠে।
যাইহোক বাসুকি কিন্তু ভীমকে কোনো শাস্তি দিলেননা। উল্টে যথেষ্ট খাতির যত্ন করে ভালো করে চিকিৎসা করালেন। ভীম সুস্থ হয়ে কয়েকদিন পরে হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন। বাসুকি নাগ ভাবলেন কুরু রাজ্যের সাথে বাসুকীর নাগলোকের সম্পর্ক আরেকটু দৃঢ় হবে, বর্তমান রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে যা খুব জরুরি। এখন বিভিন্ন কারনে নাগ ও আর্যদের মধ্যে এমন তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে যে , যেকোনো সময় আর্যদের জনপদগুলো একসাথে মিলে নাগেদের জনপদগুলিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। নাগেরা আর্যাবর্তে প্রভাবশালী হলেও যুদ্ধবিদ্যায় আর্যদের তুলনায় অনেক দুর্বল। কোনোরকম সংঘাতের পথে গেলে নাগেদের চরম ক্ষতি।
XXXXXX
আরো কয়েক বছর পরের কথা। কুরুরাজ্যের দখল নিয়ে পান্ডব ও কৌরবদের মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে রেষারেষি। ভীষ্ম নিজেও আর এই ঝামেলা সামলাতে পারছেননা। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কুরুরাজ্যকে ভাগ করা হবে,আর পাণ্ডবদেরকে দেওয়া হবে ঘন জঙ্গলে ভরা খাণ্ডবপ্রস্থ জায়গাটি ।পাণ্ডবদেরকে ওই জায়গার সম্প্রসারণ করে নতুন রাজধানী বানাতে হবে। কাজটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, তবে পাণ্ডবদের বড়ভাই যুধিষ্ঠির এতেই রাজি হলেন। কুন্তীর দূরসম্পর্কের আত্মীয়, দ্বারকার রাজা কৃষ্ণও পাণ্ডবদের একই পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণ পাণ্ডবদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রধান পরামর্শদাতা।
জঙ্গল পরিষ্কার করে জনপদ স্থাপন করা অবশ্য আর্যদের কাছে নতুন কিছু ব্যাপার নয়। বর্তমানের অনেক জনপদই জঙ্গল পরিষ্কার করে তৈরী হয়েছে। জঙ্গল পরিষ্কার করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো আগুন লাগিয়ে দেওয়া। পাণ্ডবরাও সেই একই পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। প্রধান দায়িত্ব নিলেন অর্জুন ও কৃষ্ণ। তাঁরা একটি ছোট সৈন্যদল নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের সবচেয়ে শুকনো একটি এলাকায় অগ্নিসংযোগ করলেন। কিন্তু খাণ্ডববন জ্বালাবার সময়ে আরো কিছু অন্য ঘটনা অপেক্ষা করছিলো।
ধীরে ধীরে জঙ্গলের আগুন সাংঘাতিক রূপ ধারণ করলো। শয়ে শয়ে জন্তু জানোয়ার প্রচন্ড চিৎকার করতে করতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে মৃত্যুবরণ করলো । আগুনের লেলিহান শিখার থেকে আকাশের পাখিরাও মুক্তি পেলোনা । প্রচন্ড উত্তাপে ডানা জ্বলে, চোখ ফেটে তারা আগুনের ওপর পড়তে শুরু করলো। শরীরে আগুন লেগে আগুনের পিন্ডের মতো জঙ্গলের মধ্যে জানোয়ারদের ইতস্তত দৌড়াদৌড়ি এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সৃষ্টি করলো।আগুনের থেকে কোনোমতে বেঁচে জঙ্গলের বাইরে বেরোলেও তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং কৃষ্ণ ও অর্জুন।বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে একের পর এক তাদের হত্যা করে চলেছেন তাঁরা।একটু অন্যরকমের শিকার খেলা আর কি !
কৃষ্ণ ও অর্জুন ঠিক করেছিলেন জঙ্গলে বসবাসকারী একটি জন্তুকেও রেহাই দেওয়া হবেনা, কারণ তারা নতুন জনবসতিতে উৎপাত করতে পারে। কিন্তু শুধু কি জন্তু জানোয়ার ? এই জঙ্গলে যে অনেক মানুষেরও বসবাস!! এখানে অনেক যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, নাগ, গন্ধর্ব ও অসুরেরও বসবাস আছে। না, তাদেরকেও ছাড়া হলনা, তারাও পাণ্ডবদের বিরক্ত করতে পারে । শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর হত্যালীলা। অসহায় মানুষগুলো তাদের পরিবার সমেত আগুন এবং অস্ত্রাঘাতে মৃত্যুবরণ করতে শুরু করলো।
দেবরাজ ইন্দ্র খবর পেয়ে বিচলিত হয়ে উঠলেন ।খাণ্ডববনে তাঁর বন্ধু তক্ষক এর বসবাস।তিনি একটি সৈন্যদল নিয়ে অর্জুন এবং কৃষ্ণকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। একটি ছোটোখাটো যুদ্ধ লেগে গেলো। কিন্তু দেবতারা অর্জুনদের নিরস্ত করতে পারলোনা ।এরই মধ্যে ইন্দ্র খবর পেলেন যে তক্ষক জঙ্গলে নেই, কোনো কাজে তিনি কুরুক্ষেত্র গেছেন। আরো জানা গেলো অর্জুন দেবতাদের পরিচিত কুরুবংশের সন্তান।ফলে অর্জুনকে আর তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেননা। জঙ্গল জ্বলতেই থাকলো ।
তক্ষকের শিশুপুত্র অশ্বসেন এবং স্ত্রী কিন্তু জঙ্গলেই উপস্থিত ছিল। শিশুটির মাথার চুল এবং হাত আগুনে প্রায় দগ্ধ হয়ে গেছিলো। তার নিরুপায় মা তাকে দুহাতে ঘিরে ধরে বাঁচাবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারলেননা। আগুনে তিনি অর্ধদগ্ধ হয়েই গেছিলেন , এর ওপর অর্জুনের একটি তীর এসে তাঁর মাথাকে শরীরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। অশ্বসেনও হয়তো রেহাই পেতোনা, কিন্তু অর্জুনের ক্ষনিকের অন্যমনস্কতার সুযোগে সে পালিয়ে গেলো ।
পরের দিন ইন্দ্র অশ্বসেন কে তক্ষকের হাতে সমর্পন করে সব জানালেন। রাগে দুঃখে তক্ষক প্রতিজ্ঞা করলেন অর্জুনের এই কর্মের প্রতিশোধ তিনি নেবেন।
তক্ষক অবশ্য ইতিমধ্যে সমস্ত আর্যদেরকেই শত্রূ হিসাবেই গণ্য করতে শুরু করেছিলেন । আর্য মুনি ঋষিদেরকেও তক্ষক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিভিন্ন ভাবে উত্যক্ত করা শুরু করেছিল । ফলস্বরূপ তক্ষকের অনেক শত্রূর সৃষ্টি হয়ে গেছিলো।
উতঙ্ক নামের এক মুনি তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রমে থাকার সময় একবার গুরুপত্নীর জন্য একটি বড়ো আকারের কানের দুল নিয়ে যাচ্ছিলেন। দুলটি গুরুমাতাকে গুরুদক্ষিণা হিসাবে দিলে তিনি উতঙ্ককে ব্রহ্মচর্যাশ্রম থেকে মুক্তি দিতেন। এটি আবার তিনি চেয়ে এনেছিলেন পৌষ্য রাজার রানীর কাছ থেকে। তক্ষক অল্পবয়সী এই মুনিকে জঙ্গলের মধ্যে সোনার দুল নিয়ে একলা যেতে দেখে তামাশা করার লোভ সামলাতে পারলেননা। হঠাৎ করে কুন্ডলটি নিয়ে তিনি দৌড় লাগালেন।উতঙ্ক তাঁকে ধাওয়া করতে করতে একটি গুহার মধ্যে দিয়ে গিয়ে কাছের একটি বিশাল নাগ জনপদে উপস্থিত হলেন । এই জনপদটি ছিল পোড়ামাটির চারকোনা কৃত্রিম পাথরের বাড়ি দিয়ে তৈরী একটি বিরাট শহর। উতঙ্ক জীবনে এতো বড়ো বড়ো ঘরবাড়ি দেখেননি। কি করবেন তিনি, ভেবে ভেবে আর কুলকিনারা পাচ্ছিলেননা । অবশেষে এক স্থানীয় ব্যক্তির সহায়তায় তক্ষক কে ভয় দেখিয়ে তিনি কুন্ডলটি উদ্ধার করতে সমর্থ হলেন । উতঙ্ক প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি এর প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বেন।তক্ষকের আরো একজন শত্রূর সৃষ্টি হলো।
XXXXXX
এরপরে অনেক দিন চলে গেছে। বর্তমানে তক্ষক তক্ষশীলা নামে একটি বড়ো জনপদ স্থাপন করে সেখানে রাজত্ব করছেন। তাঁর স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। পোড়া মাটির চারকোনা কৃত্রিম পাথর দিয়ে একটি বিশাল শহর তৈরী করাতে তিনি সমর্থ হযেছেন। অশ্বসেন অনেক বড়ো হয়ে গেছে ও নানা রকম যুদ্ধবিদ্যা শিখছে। অশ্বসেন কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তার মায়ের হত্যাকারীর ওপর শোধ নেওয়ার কথা ভুলতে পারেনি।
এদিকে খাণ্ডব বন ধ্বংস করে ময়দানবের সহায়তায় পাণ্ডবরা স্থাপন করেছিলেন ইন্দ্রপ্রস্থ শহর।কিন্তু এই শহর তাঁরা বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি । খুড়তুতো ভাইদের চক্রান্তে পাণ্ডবরা রাজ্যহারা হয়ে অনেক বছর জঙ্গলবাসী হয়ে ছিলেন । যুদ্ধ ছাড়া হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনা নেই দেখে পাণ্ডবরা এখন সেই রাস্তাই ধরেছেন । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ।
তক্ষক ভাবলেন এই সুযোগে কৌরবদের সাথে মিলে অর্জুনকে যেমন করে হোক পর্যুদস্ত করতে হবে। পরিকল্পনামত তাঁর পুত্র অশ্বসেন নিজের কিছু সৈন্য নিয়ে কৌরব দলে যোগদান করার জন্য দুর্যোধনের কাছে অনুমতি চাইলো । দুর্যোধন জানতেন নাগেরা কখনো সামনাসামনি যুদ্ধে কৃতকার্য হতে পারেনা, বরং অন্য রকম ছল করে তারা শত্রূকে হত্যা করতে পারে। তিনি শুধু বললেন, কর্ণ যখন অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করবে,তখন সে যেন কর্ণের কাছাকাছি থাকে। অশ্বসেনও জানতো, তার একার পক্ষে অর্জুনের মতো যোদ্ধাকে হারানো সম্ভব নয় । কর্ণকে সরাসরি সাহায্য করার কথা বললে তিনি রাজি হবেননা। তাই সে অন্যভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলো। প্রথমেই সে কর্ণের তূণীরের কতকগুলো তীরের মধ্যে কর্ণের অজান্তে বিষ লাগিয়ে দিলো। দুর্ভাগ্যবশত এই তীরগুলির একটাও অর্জুনের গায়ে লাগলোনা। এরপরে সে একটি বিশেষ ধরণের ফাঁপা তীরের ভিতরে একটি জীবন্ত বিষাক্ত সাপ রেখে সেটি ঢুকিয়ে দিলো কর্ণের তূণীরে। এই তীরের সামনের অংশটি আঘাতে ভেঙে গেলেই সাপটি বেরিয়ে আসবে। এই কাজটিও সে করলো কর্ণকে না জানিয়ে । কর্ণ বিশেষ কিছু না দেখেই সেই তীর ছুঁড়লেন, কিন্তু তাও লক্ষভ্রষ্ট হলো।এরপর অশ্বসেন সেই তীরটি উঠিয়ে এনে কর্ণকে সরাসরি অনুরোধ করলো সেটি আবার ব্যবহার করার জন্য। এবার কর্ণ বিরক্ত হয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু সেও ছাড়ার পাত্র নয়। এবার সে নিজের হাতে সাপ নিয়ে অর্জুনের রথের দিকে ধেয়ে গেল। অর্জুনের সারথি কৃষ্ণ সতর্ক ছিলেন। অশ্বসেনকে দেখার সাথে সাথে তিনি অর্জুনকে ইশারা করলেন। মুহূর্তের মধ্যে অর্জুনের তীরে অশ্বসেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। মায়ের হত্যার প্রতিশোধ তার আর নেওয়া হলোনা ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ হলো। কৌরবরা সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হয়ে গেলো। কুরুবংশের প্রতিনিধি হিসাবে পাণ্ডবরা একমাত্র ক্ষমতাশালী হয়ে রাজত্ব করতে শুরু করলো। পাণ্ডবদের বড়ভাই যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করে সমগ্র ভারতবর্ষে নিজের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করলেন।
তক্ষক কিন্তু এখনো হাল ছাড়লেননা। সুযোগের সন্ধানে রইলেন কবে কিভাবে পাণ্ডবদের ক্ষতি করা যায়। তাঁর স্ত্রী, পুত্র দুজনকেই তিনি হারিয়েছেন অর্জুনের হাতে।
XXXXXX
আরো অনেক দিন কেটে গেলো। পাণ্ডবরা অর্জুনের নাতি পরীক্ষিত কে রাজা করে সকলে মিলে সন্যাস নিয়ে হিমালয়ে চলে গেলেন।অর্জুন তক্ষকের হাত থেকে চলে গেলেন অনেক দূরে, কিন্তু অর্জুনের বংশের কাউকে হত্যা না করে তক্ষকের আর শান্তি নেই।
পরীক্ষিত সুশাসক, প্রজারঞ্জক রাজা। তিনি একদিন গেলেন শিকার করতে। একটি হরিণকে তীর মারার পরে সেটি নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো জঙ্গলের ভিতরে। পরীক্ষিত সেটিকে তাড়া করতে করতে জঙ্গলে ঢুকে পথ হারিয়ে ফেললেন। অনেক খুঁজেও হরিণটিকে না পেয়ে উপস্থিত হলেন শমীক ঋষির আশ্রমে।
"প্রণাম মহর্ষি।আমি হস্তিনাপুরের রাজা পরীক্ষিত। আপনি এখান দিয়ে কোনো তীরবিদ্ধ হরিণকে পালাতে দেখেছেন?"
ঋষি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন।কোনো উত্তর দিলেননা। সেইদিন তিনি মৌনধর্ম অবলম্বন করেছিলেন। পরীক্ষিত অতশত জানেননা। দুতিনবার জিজ্ঞেস করে উত্তর না পেয়ে তিনি রেগে গেলেন। শেষে মাটিতে পড়ে থাকা একটি মরা সাপ দেখতে পেয়ে সেটিকে ধনুকের আগা দিয়ে উঠিয়ে মুনির গলায় পেঁচিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। মুনি সেভাবেই বসে রইলেন।
পুরো ঘটনাটি দেখতে পেলো কৃশ নামে এক অল্পবয়েসী ঋষি। সে আবার শমীক মুনির ছেলে শৃঙ্গীর বন্ধু। এই শৃঙ্গী ঋষি আবার খুব রগচটা। একটুতেই শাপশাপান্ত করতে থাকেন। আর্যদের থেকে নাগ জাতির লোকেদের সাথে তাঁর বেশি বন্ধুত্ব। কৃশ শৃঙ্গীকে রাগিয়ে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলোনা।
"কি হে, তোমার বাবাকে পরীক্ষিত এতবড়ো অপমান করে চলে গেলো, তুমি কিছু করবেনা ? তোমার বাবা তো ভয় পেয়ে চুপচাপ বসেই রইলেন, কিছুই বললেননা। তুমিও কি তাই করবে ?"
"কেন কি হয়েছে ?"
কৃশ বেশ বাড়িয়ে বাড়িয়ে সমস্ত ঘটনাটা বললো। আর যায় কোথায় ? শুরু হয়ে গেলো শৃঙ্গীর শাপ দেওয়া।
"এতো বড়ো সাহস পরীক্ষিতের ? সে কিসের রাজা, যে একজন মুনিকে শ্রদ্ধা দেখাতে পারেনা ? আমি দেখে নেবো তাকে। আজ থেকে সাত দিনের মধ্যে সে তক্ষকের হাতে জ্বলেপুড়ে মারা যাবে।"
শৃঙ্গী তক্ষককে ভালোভাবে চিনতেন। তক্ষক যে পরীক্ষিৎকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছেন, তাও তিনি জানতেন।
তক্ষক একরকম অতি জ্বলনশীল অর্ধতরল খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছিলেন । তাঁর ছোটবেলার জায়গা, অক্ষু নদীর দক্ষিণপশ্চিম দিকের দেশগুলিতে এটি প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়।এটি ঘি বা অন্য কোনো ভেষজ তেলের মতো ধীরে ধীরে জ্বলেনা, হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে ও প্রচন্ড তাপের সৃষ্টি করে । সত্যি বলতে কি নাগেরা এটির সাহায্যে যত সহজে একটি আগুন তৈরী করতে পারে, তা আর্যরা পারেনা । তাদের কাছে আগুন তৈরী করা একটু বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার । এটি শৃঙ্গী জানতেন। এইজন্য তিনি এইরকম অভিশাপ দিলেন। অভিশাপ দেওয়ার সাথে সাথেই তিনি তক্ষক কে খবরও পাঠিয়ে দিলেন।
শমীক ঋষি কিন্তু ব্যাপারটা ভালোভাবে নিলেননা।
"তোমার এই কাজটা কিন্তু ভালো হলোনা। রাজা পরীক্ষিতের রাজত্বে আমরা বাস করি। তিনি আমাদের রক্ষা করেন বলে আমরা এতো নিশ্চিন্তে সাধন ভজন নিয়ে থাকতে পারি। তিনি যা করেছেন রাগের মাথায় কিছু না জেনে করেছেন।তুমি ওই দুরাচারী তক্ষককে কেন খবর দিতে গেলে ? আমি এখনই পরীক্ষিতের কাছে লোক পাঠাচ্ছি। তিনি অন্তত নিজেকে তক্ষকের হাত বাঁচাবার ব্যবস্থা করুন।"
পরীক্ষিৎ সব শুনে একটু ঘাবড়েই গেলেন।তক্ষকের রাজ্য তক্ষশীলা আক্রমণ করার পরিস্থিতি তাঁর তখন ছিলোনা।নাগেরা কেমন করে হত্যা করে তা তিনি জানেন। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ঘরে অনেকগুলি বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেওয়া। এছাড়া হঠাৎ করে গায়ে আগুন লাগিয়েও তারা হত্যা করে। যাইহোক সাপের বা অন্য যেকোনো রকম বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য উঁচু জায়গায় একটি বিশেষ ধরণের অস্থায়ী ঘর বানানো হলো। তিনি জানতেন তক্ষক তাঁকে মারতে হলে সাত দিনের মধ্যেই মারবেন, কারণ তক্ষক তাঁর বন্ধু শৃঙ্গী ঋষির অভিশাপ সত্যি প্রমান করতে চাইবেন।পরীক্ষিত ঠিক করলেন সাতদিন তিনি সেই ঘরেই থাকবেন। তাঁর ঘরের আশে পাশে সবসময়ে থাকবে নানারকম সাপের ওঝা, গুনীন ও ব্রাহ্মনরা। কশ্যপ গোত্রের এক মুনিকেও খবর দেওয়া হলো আসার জন্য। কশ্যপ মুনির শিষ্যরা কাশ্যপ নাম পরিচিত । তাঁরা বিষক্রিয়া বা অন্য অনেক রকম অপমৃত্যু থেকে লোককে বাঁচাবার পদ্ধতি জানেন।
সিদ্ধান্তমতো পরীক্ষিৎ অনেক ওষুধপত্র নিয়ে সেই ঘরে সাত দিনের জন্য আশ্রয় নিলেন। কিন্তু ভবিতব্য কিছু আলাদা ছিল। তক্ষকের সাথে রাস্তায় দেখা হলো কাশ্যপ মুনির।তক্ষক তাঁর সাথে কথা বলে সব জানতে পারলেন।
-"মুনিবর আপনাকে যেতে হবেনা। আমার হাত থেকে তার রক্ষা নেই।"
-"মানে ? তুমি কে ?
-"আমিই তক্ষক। পরীক্ষিৎকে ভস্ম করতে যাচ্ছি।"
-"তাই নাকি ? দেখি তোমার কত ক্ষমতা। এই গাছটাকে ভস্ম করে দেখাও তো ?"
তক্ষক সেটির ওপর কিছু তরল পদার্থ ছুঁড়ে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গাছটি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। কাশ্যপ এই খনিজটির কথা জানতেন। তিনি সাথে সাথে কিছু পদার্থের গুঁড়ো সেটির ওপর ছুঁড়ে মারলেন। আগুন নিভে গেলো।
তক্ষক তবুও হাল ছাড়লেননা
-"দয়া করে যাবেননা, আমি আপনাকে অনেক ধনসম্পত্তি দেব। "
-"কত দেবেন ? রাজার থেকে বেশি ?"
-"রাজা যত দেবেন বলে আপনি আশা করেন, তার দ্বিগুন দেব"
কাশ্যপ মুনি আর তর্কবিতর্ক করলেননা। সেখান থেকেই ধনসম্পত্তি নিয়ে ফিরে গেলেন।
অভিশাপের সপ্তম দিন। রাজা পরীক্ষিৎ তাঁর সেই ঘরটিতে বসে আছেন, এমন সময়ে তাঁর একজন দেহরক্ষীর প্রবেশ।
-"মহারাজ একজন ব্রাহ্মণ আপনাকে আশীর্বাদ করতে এসেছেন।"
-"নিয়ে এস তাকে। ব্রাহ্মণদের থেকে আমার কোনো ভয় নেই।"
একটু পরে ব্রাহ্মণবেশী তক্ষক প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে একটি থালায় কিছু ফল, কমণ্ডলু, জ্বলন্ত প্রদীপ। তক্ষক কমণ্ডলু থেকে মন্ত্রপূতঃ তরল ছিটিয়ে পরীক্ষিৎকে আশীর্বাদ করলেন। রাজার পাশে ঘরের অন্যান্য অংশেও সেটি ছড়িয়ে দিলেন। পরীক্ষিত বুঝতে পারলেন তরলটি জল নয়, একটি বিশেষ গন্ধযুক্ত কোনো তরল, কিন্তু কিছু সন্দেহ করলেননা ।
"হে ব্রাহ্মণ, আপনার আশীর্বাদের জন্য ধন্যবাদ। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আজকে সপ্তম দিন। মনে হয় তক্ষক আর আমাকে মারতে পারলোনা।"
রাজার কথা শেষ হতে না হতেই তক্ষক রাজার দিকে জ্বলন্ত প্রদীপটি ছুঁড়ে দিলেন । সাথে সাথে পরীক্ষিতের শরীরে ও সমস্ত ঘরে আগুন লেগে গেলো। কেউ ছুটে আসার আগেই তক্ষক লাফ দিয়ে পালিয়ে গেলেন। সব ভস্ম হয়ে গেলো।
XXXXXX
কুরুবংশের মতো প্রভাবশালী বংশের রাজা পরীক্ষিৎকে নাগরাজ তক্ষক ছল করে হত্যা করেছে । পরীক্ষিতের ছেলে জনমেজয় নাকি প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেবেন। যদিও জনমেজয় এখনো শিশুমাত্র, সবে রাজা হয়েছেন, কিন্তু একদিন তো তিনি ক্ষমতাশালী হবেন। কুরুরাজ্যের প্রতিবেশী নাগরাজ বাসুকি বুঝতে পারছিলেন, এই ঘটনাটি কুরুরাজ্য ছাড়াও অন্যান্য আর্য জনপদের রাজারা ভালোভাবে মেনে নেবেননা। নাগেদের বিরুদ্ধে ক্রমশ ক্ষোভ বেড়ে চলেছে। যেকোনো সময় নাগেরা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বাসুকী এর আগেও অনেক রকম ভাবে এই শত্রূতা প্রশমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একটু বেশি জটিল হয়ে গেছে । বাসুকি তাও চেষ্টা ছাড়লেননা। নাগ জনপদগুলোর রাজাদের নিয়ে তিনি একটি সভা ডাকলেন। এই পরিস্থিতিতে কি করা যায় এই নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। ক্ষুদ্রবুদ্ধি নাগ রাজারা বিশেষ কিছু মন্ত্রণা দিতে পারলোনা। কেউ বলে চলো পরীক্ষিতের ছেলেকে মেরে ফেলি, কেউ বলে চলো আমরা ওই রাজ্যে মন্ত্রীর কাজ গ্রহণ করি আর ভুল মন্ত্রণা দি, কেউ বলে চলো আমরা ব্রাহ্মণ সেজে ওই রাজ্যে যাই, আর ওদের সমস্ত যজ্ঞ পন্ড করে দি, তাহলে তাদের খুব পাপ লাগবে।এলাপত্র নামের এক নাগ এইসব শুনে আর থাকতে পারলেননা।
"হয়েছে, তোমাদের অনেক মতামত দেওয়া হয়েছে, এবার আমার কথা শোনো। আর্যরা সাধারণত মুনি ঋষিদের বিশেষ শ্রদ্ধা ভক্তি করেন। তাঁদের কথা সহজে ফেলেননা। যেসব মুনিদের সাথে আর্য রাজাদের ভালো সম্পর্ক আছে, তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আমি বাসুকিকে অনুরোধ করবো তিনি যেন তাঁর বোনের সাথে এইরকম কোনো মুনির বিয়ে দেন। এই মুনিরা এমনকি তাঁদের সন্তানরাও নাগেদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন হবে। তোমরাও এইরকম কিছু করো।"
এই কথাটি সবার খুব মনে ধরলো। সবাই ঠিক করলেন নিজের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী আর্যদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করবেন।
সভা তখনকার মতো শেষ হলো। বাসুকি এলাপত্রর কথামতো মুনির সন্ধান করা শুরু করলেন। অনেক খুঁজে জরৎকারু নামের এক জনপ্রিয় মুনির সন্ধান পাওয়া গেলো। তিনি নাকি খুব মহান মুনি।তিনি এমন জপ তপস্যা করেন যে নিজের শরীর খারাপ হয়ে গেলেও তাঁর ভ্রূক্ষেপ থাকেনা । ভাগ্যক্রমে তিনি এই সময়ে পূর্বপুরুষের ঋণ শোধ করার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।জরৎকারু বিয়ে করে সন্তানের বাবা হলে নাকি পিতৃপুরুষের ঋণ শোধ হবে। ফলে খুব তাড়াতাড়ি জরৎকারু মুনির সাথে বাসুকির বোনের বিয়ে হয়ে গেলো। কিছুদিন পরে তাঁদের এক পুত্রসন্তান এর জন্ম হলো। তার নাম দেওয়া হলো আস্তীক।
XXXXXX
পরীক্ষিতের ছেলে জনমেজয়। পরীক্ষিতের মৃত্যুর পর খুব ছোটবেলায় তিনি রাজা হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি সতেরো বছরের যুবক। খুব ছোট থেকেই তাঁর বাবার মৃত্যুর সম্বন্ধে বার বার শুনে এসেছেন। প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি এর শোধ নেবেন। তক্ষক যেমনভাবে তাঁর বাবাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিলো, তিনিও সেইভাবেই তক্ষক আর তার জাতভাইদের পুড়িয়ে মারবেন । এমনিতে তিনি খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাঁর উৎসাহে রাজ্যে সবসময়ে যাগযজ্ঞ লেগেই আছে। ব্রাহ্মণরা সবসময়ে তাঁর গুনকীর্তন করছেন। পরীক্ষিত খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋষি ও ব্রাহ্মণদের নিয়ে আসেন যাগযজ্ঞ করার জন্য।
জনমেজয় এর তিন ভাই একদিন যজ্ঞ করছেন, একটা অশুভ ঘটনা ঘটলো। যজ্ঞ চলার সময়ে সেখানে একটি কুকুর এসে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করলো। তারা বিরক্ত হয়ে কুকুরটিকে খুব মেরে তাড়িয়ে দিলো। কুকুরটি চিৎকার করতে করতে এসে হাজির হলো তার কর্ত্রী, সরমার কাছে। আর যায় কোথায় ! সরমা দৌড়ে চলে এলো ঝগড়া করতে।
"তোদের এতো বড়ো সাহস,আমার কুকুরকে তোরা মেরেছিস ! ও কি ক্ষতি করেছিল তোদের ? কোনো কিছুতে মুখ দেয়নি, কিছু নোংরা করেনি, তোদের এতো কিসের যজ্ঞ ? এখন থেকে তোরা কোনোদিন কোনো যজ্ঞের ফল পাবিনা, দেখে নিস।"
এই অভিশাপকে জনমেজয়ের ভাইরা বিশেষ পাত্তা না দিলেও জনমেজয় খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমনিতেই তিনি ধর্মভীরু মানুষ, এই ঘটনায় আরো মুষড়ে পড়লেন। সরমার অভিশাপ কাটাবার জন্য আবার অন্য একটি যজ্ঞ করার প্রস্তুতি শুরু করলেন। সন্ধান পেলেন সোমশ্রবা নামের এক ঋষির। ঘটনাচক্রে বা বাসুকির জনসংযোগের কল্যানে এই ঋষির বাবা শ্রুতশ্রবা হলেন আর্য,আর মা হলেন নাগবংশের। শ্রুতশ্রবা জনমেজয় কে বোঝালেন যে জনমেজয়ের সমস্যার সমাধানের জন্য সোমশ্রবার মতো ঋষি আর হয়না , তাঁকে তিনি নিজের রাজ্যে রেখে বিভিন্ন যজ্ঞের জন্য পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত করতে পারেন। জনমেজয় আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু সোমশ্রবার একটি শর্ত আছে । কোনো ব্রাহ্মণ যদি কিছু তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন, তবে তিনি তা পূরণ করবেন, এবং অবশ্যই তা পূরণ হবে জনমেজয়ের দ্বারা । জনমেজয় তাতেই রাজি। সোমশ্রবাকে নিজের রাজ্যে নিয়ে এসে ভাইদের এবং অন্য সবাইকে নির্দেশ দিলেন, সোমশ্রবা যখন যা চাইবেন, তাই যেন দেওয়া হয়।
জনমেজয় তক্ষককে জব্দ করার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে তক্ষশীলা নগর আক্রমণ করলেন। বেশি শক্তিক্ষয় করতে হলোনা, খুব সহজেই এই নাগ জনপদে তাঁর অধিকার স্থাপন হলো। যুদ্ধজয় তো হলো, কিন্তু তক্ষককে তিনি হাতে পেলেননা। বর্তমানে তক্ষকের অন্যান্য ভাইয়েরাই রাজত্ব চালাচ্ছিলেন । তক্ষক এখন আছেন বানপ্রস্থে, তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া গেলোনা।
জনমেজয়ের রাগ শান্ত হলোনা। তক্ষক এবং তার জাতভাইদের এক ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেওয়ার কথা তাঁর মনকে বার বার আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিলো । এরমধ্যে হঠাৎ একদিন তাঁর কাছে আগমন হলো উতঙ্ক ঋষির। উতঙ্কও সুযোগ খুঁজছিলেন কেমন করে তক্ষককে হত্যা করা যায়। তাঁর ছোটবেলার ঘটনা তিনি ভোলেননি। প্রথামাফিক সম্মান প্রদর্শনের পর জনমেজয় ঋষিকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর আগমনের কারন।
"মহারাজ, আমি যে কাজের জন্য এসেছি, সেটি তো আসলে আপনারই কাজ। আপনি কি ভুলে গেছেন , তক্ষক কিভাবে বিনা দোষে আপনার বাবাকে হত্যা করেছিল ? আপনি এখনো আপনার প্রতিজ্ঞামতো তক্ষকের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারলেননা। আর্যাবর্তের অন্যান্য রাজাদের কাছে আপনার সম্মানহানী হচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি কিছু করুন। আপনি যদি চান, আমি আপনাকে সমস্ত রকম পরামর্শ বা সাহায্য করতে পারি।"
জনমেজয়ের মনে এতদিন যে আগুন ছিল, উতঙ্কর কথা তাতে যেন ঘি ঢাললো । জনমেজয় উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সাথে সাথে ডাক পড়লো সোমশ্রবা ও অন্যান্য ঋষিদের।
শুরু হলো সর্পযজ্ঞের প্রস্তুতি। এ এক সম্পূর্ণ অন্য রকমের যজ্ঞ। সমস্ত নাগ বা সর্পজাতিকে হত্যা করার এক ভয়ঙ্কর যজ্ঞ।এক বিশাল যজ্ঞকুণ্ড তৈরী করা হলো,যার ভিতরে অনেকজন মানুষকে একসাথে ফেলে পুড়িয়ে দেওয়া যায়। আগুনের উত্তাপ অনেকদিন ধরে একই রকম রাখার জন্য যজ্ঞকুন্ডের বিশেষ ধরণের আকার দেওয়া হলো। সমস্ত নাগজাতি যতোদিননা ধ্বংস হচ্ছে, ততদিন ধরে এই যজ্ঞ চলবে।অনেকে অনেকরকম ভাবে এই যজ্ঞ বন্ধ করার চেষ্টা করলেন, কিন্ত সব বিফল হলো।
যজ্ঞ শুরু হওয়ার দিন, বাসুকির পরিচিত, লোহিতাক্ষ নামের এক বাস্তুশাস্ত্র বিশারদ যজ্ঞ বন্ধ করার শেষ চেষ্টা করতে চাইলেন , বলে উঠলেন,
"এই যজ্ঞকুণ্ড এমনভাবে বানানো হয়েছে, যে দেখে মনে হচ্ছে কোনো ব্রাহ্মণ এই যজ্ঞে বাধার সৃষ্টি করবেন।"
ফল উল্টো হলো। জনমেজয় নির্দেশ দিলেন যজ্ঞ চলাকালীন বাইরের কাউকে যেন কাছাকাছি আসতে দেওয়া না হয় । যজ্ঞ শুরু করার আর কোনো বাধা রইলোনা।পুরোহিতেরা কালো পোশাক পরে উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্রপাঠ করতে করতে যজ্ঞকুন্ডে বিভিন্ন রকম জ্বালানী দিতে থাকলো। অন্যদিকে প্রত্যেকদিন জনমেজয়ের সৈন্যরা একের পর এক নাগেদের গ্রামে আগুন লাগাতে থাকলো। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে এলে সৈন্যরা স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে ধরে হাত পা বেঁধে যজ্ঞকুন্ডের দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। বৃদ্ধ, শিশু, অসুস্থ কাউকে ছাড়া হলোনা। প্রত্যেকদিন একের পর এক অসহায় মানুষগুলোকে বেঁধে বেঁধে যজ্ঞকুন্ডে ছুঁড়ে ফেলা হতে থাকলো । যজ্ঞকুন্ডে ক্রমান্বয়ে আহুতি দেওয়া হতে থাকলো অতি জ্বলনশীল পদার্থের। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের আর্তনাদে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠলো। কিছুদিন পরে যজ্ঞকুণ্ড থেকে বেরোতে থাকলো দুর্গন্ধ, বয়ে আসতে থাকলো রক্ত ও চর্বির ধারা । এতো কিছুর পরেও কারোর কোনো বিকার দেখা গেলোনা। আর্যদের কাছে এইরকম গণহত্যা কোনো নতুন ব্যাপার নয়। অবসর বিনোদনের জন্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন মুনি। তিনি সবাইকে মাঝে মাঝে বেদব্যাস রচিত বিজয়া মহাকাব্য শোনাতে থাকলেন। এই কাব্যটিতে জনমেজয়ের পূর্বপুরুষদের বীরত্বের মহাগাথা রচনা করা আছে।
বৃদ্ধ ও অসহায় তক্ষক প্রচন্ড ভয় পেয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের শরণ নিলেন। ইন্দ্র তাঁকে নিজের প্রাসাদে লুকিয়ে রাখলেন।
বাসুকি সব খবর পেলেন। এতদিনে তাঁর নিজের ভাগ্নে, জরৎকারু মুনির ছেলে আস্তীক অনেক বড়ো হয়ে গেছে। সোমশ্রবার সাথে আগেই কথা বলা ছিল, এবার আস্তীককে শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠালেন যজ্ঞ বন্ধ করার জন্য। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যজ্ঞ চলাকালীন কোনো ব্রাহ্মণ রাজার কাছে কিছু প্রার্থনা করলে রাজার কর্তব্য হলো সেই প্রার্থনা অবশ্যই পূর্ণ করা। না হলে অধর্ম হবে। এটাই শেষ চেষ্টা। জনমেজয় ধার্মিক রাজা। আশা করা যায় আস্তীকের অনুরোধে তিনি যজ্ঞ বন্ধ করবেন।
আশানুরূপ ভাবেই আস্তীককে প্রথমে যজ্ঞস্থলে ঢুকতে দেওয়া হলোনা। এবার আস্তীক বাইরে থেকেই চিৎকার করে শুরু করলেন জনমেজয়ের প্রশংসা, তাঁর বংশের প্রশংসা। জনমেজয়ের প্রজাবৎসলতা,দান ধ্যান এসব নিয়ে তিনি এমন বলা শুরু করলেন যে ভেতর থেকে জনমেজয় আর থাকতে পারলেননা।
"এই মুনি অল্পবয়েসী হলেও অনেক কিছু জানেন মনে হচ্ছে, এনাকে ভিতরে আসার অনুমতি দিলে কেমন হয় ? আমি এনার ইচ্ছাপূরণ করতে চাই।"
সোমশ্রবা সাথে সাথে রাজি। অন্য একজন মুনি বললেন
"মহারাজ, এতো তাড়াতাড়ি এই ব্রাহ্মণের ইচ্ছাপূরণ করা কি ঠিক হবে ? তক্ষক এখনো ধরা পড়েনি।একটু সাবধানে কথা বলবেন। ইনি যা চাইবেন, তাই তাঁকে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু যজ্ঞ শেষ হওয়ার পরে।"
এর মধ্যে খবর পাওয়া গেলো তক্ষক ইন্দ্রের প্রাসাদে গিয়ে লুকিয়ে আছে। সাথে সাথে আদেশ হলো, ইন্দ্রকে শুদ্ধ তক্ষককে ধরে নিয়ে আসা হোক। এবার একটি সৈন্যদল গেলো তক্ষক ও ইন্দ্র দুজনকেই ধরে আনার জন্য।
তক্ষক ধরা পড়ে গেলেন। ইন্দ্র তাঁকে ফেলেই পালিয়ে গেলেন। তক্ষককে ধরে আনতে দেখে অন্যান্য ব্রাহ্মণরা এবার নিশ্চিন্ত হলেন। জনমেজয়কে অনুমতি দিলেন আস্তীকের প্রার্থনা অনুযায়ী বর দেওয়ার জন্য। জনমেজয় আস্তীককে অনুরোধ করলেন বর প্রার্থনা করার জন্য।
-"মহারাজ আমি চাই আপনার এই যজ্ঞ এই মুহূর্তে বন্ধ হোক।"
-"হে মুনি আপনি এই যজ্ঞ বন্ধ করার প্রার্থনা করা ছাড়া যা চাইবেন তাই দিতে রাজি আছি। আপনি সোনা, রুপা, ধনসম্পদ, গরু, যা চাইবেন, যত চাইবেন আমি তত দিতে রাজি আছি। দয়া করে যজ্ঞ বন্ধ করার প্রার্থনা করবেননা "
-"মহারাজ, আমি অন্য কিছু চাইনা, দয়া করে এই যজ্ঞ বন্ধ করুন।"
অনেক বোঝাবার পরেও আস্তীককে রাজি করানো গেলোনা। সোমশ্রবার নেতৃত্বে কিছু ব্রাহ্মণ বলে উঠলেন
"মহারাজ আপনি যদি এই ব্রাহ্মণের প্রার্থনা পূরণ করবেন বলেছেন, তাহলে তা পূরণ করা আপনার অবশ্যকর্তব্য।এই যজ্ঞ বন্ধ করুন মহারাজ। অনেক হত্যা হয়েছে। এইভাবে একটা সমস্ত জাতিকে শেষ করে আপনি কারোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারেননা। একজন রাজার এই কর্ম শোভা পায়না "
এই কথার সাথে সাথে সোমশ্রবা তাঁকে দেওয়া জন্মেজয়ের প্রতিশ্রুতিটি মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না।
সোমশ্রবার মতো নাগ বংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য মুনিরা অনেক বোঝাবার পরে অবশেষে জনমেজয় রাজি হলেন। হয়তো তিনিও মনে মনে চাইছিলেন এই যজ্ঞ বন্ধ হোক, কিন্তু রাজার অহং তাঁকে বাধা দিচ্ছিলো। এরপর নির্দেশ হলো,
"এই যজ্ঞ বন্ধ হোক, সাপেরা নিরাপদে থাকুক। আস্তীক ঋষি প্রসন্ন হোন। সেই বাস্তুশাস্ত্র বিশারদের কথা সত্যি হোক।"
অবশেষে যজ্ঞ বন্ধ করা হলো। উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট মুনিরা জনমেজয়ের নামে জয়ধ্বনি করে উঠলেন। মৃত্যুর এই হাহাকার আর কেউই সহ্য করতে পারছিলেননা। তক্ষককে মুক্তি দেওয়া হলো।
আস্তিক মুনি অবশিষ্ট সাপেদের বা নাগেদের জনপ্রতিনিধিদের এক সভায় ডাকলেন। তক্ষক সহ সমস্ত নাগেরা এক কথায় আর্যদের সাথে সন্ধির প্রস্তাবে রাজি গেলো । নাগেরা আর কখনো কোনো আর্য ব্যক্তির ক্ষতি করবেনা বলে স্থির হলো । যদি কোনো সাপ কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করে , তবে সে যেন তাকে আস্তীক, জরৎকারু প্রভৃতি ঋষির নাম বলে এই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
সাধারণ মানুষ অনেক দিন পরে স্বস্তি পেলেন। বাসুকির উদ্দেশ্য সফল হলো। আস্তীকের ওপর তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। তাকে নিয়ে নাগ সমাজেও আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো।
এইভাবে শেষ পর্যন্ত আটকানো গেলো একটি ভয়ঙ্কর গণহত্যার ঘটনা। নাগ জাতিকে আর ধ্বংস করা গেলোনা। অদূর ভবিষ্যতে নাগ,সুপর্ণ, আর্য, অসুর ,যক্ষ এবং অন্যান্য উপজাতি মিলেমিশে সৃষ্টি করলো আরো অনেক নতুন উপজাতির । শুরু হলো এক নতুন প্রজন্মের , ভবিষ্যতে যা পরিচিত হবে ভারতীয় সভ্যতা হিসাবে।


Praiseworthy. The love and interest of the author in such a topic is quite rare. Keep it up. We will for the next story.
ReplyDelete