Story - Ganga (The canalizing of Ganga by Bhagiratha)

গঙ্গাবতরণ : এক প্রাচীন নদী প্রকল্প    

সুব্রত ভট্টাচার্য্য 

      গভীর রাত।  রাজা ভগীরথের চোখে ঘুম নেই।  তাঁর গুহার সামনে একটি পাথরের ওপর বসে তিনি গভীর চিন্তা করে চলেছেন। এই তপস্যার শেষ কোথায় ? গরমকাল শেষ হতে চললো, এখনো তিনি সুষ্পষ্ট ভাবে কোনো নকশা তৈরী করে উঠতে পারলেননা। আর কত প্রজন্ম কেটে যাবে, এই কাজ সম্পন্ন করতে ? কাজ শুরু করেছিলেন তাঁর সপ্তম পূর্বপুরুষ রাজা সাগর। আর আজ ? শিবালিক পাহাড়ের পর থেকে নদীর গতিপথ তৈরির কাজ প্রায় আশি শতাংশ হয়ে গেলেও এই শিবের জটার মতো পর্বতের গোলকধাঁধা থেকে তিনি এখনো কোনো নদী কে বের করে আনতে পারলেননা। তাঁর সঙ্গের অন্যান্য লোকজনেরা একটু নিচের দিকের উপত্যকায় তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছেন। প্রায় তিন বছর লেগে গেলো শুধু এই এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন জলাশয়, তার উচ্চতা, প্রকৃতি, জলধারণের ক্ষমতা প্রভৃতি হিসাব করতে। হিমালয়ের কাছে দেবলোকে বসবাসকারী দেবতারা ভগীরথের নদী খনন করার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, তাঁরা ভাবতে পারেননি যে ভগীরথ সত্যিসত্যিই এই কাজে হাত দেবেন, যা সেই  সাত প্রজন্ম আগের সাগর রাজার সময় থেকে চলে আসছে, কিন্তু সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। সাত প্রজন্মের মধ্যে অবশ্য প্রযুক্তিবিদ্যার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কোশল রাজ্যের দক্ষিণপূর্বে হঠাৎ করে আবিষ্কার হয়েছে এক নতুন ধাতুর, সকলে যার নাম দিয়েছে লোহা। এই লোহা থেকে তৈরী হয়েছে কোদাল, গাঁইতি। এই ধাতু সাগর রাজার আমলের কাঁসা বা পিতল থেকে অনেক শক্তপোক্ত। এই ধাতু দিয়ে তৈরী কোদাল বা গাঁইতি পাথর দিয়ে তৈরী সামগ্রীর মতো ভঙ্গুরও নয়।

    ভগীরথের প্রধান পরামর্শদাতা ব্রহ্মা প্রথমেই বলেছিলেন, "যা করবে ভেবে চিন্তে কোরো।" প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মা নিজে দেবতা হওয়ার ফলে এই এলাকার ভূমিরূপ সম্বন্ধে যতটা জানতেন, ভগীরথ তার কিছুই জানতেননা। অনেক কষ্টে ভগীরথ ব্রহ্মাকে রাজি করিয়েছিলেন যাতে কিছুদিন অন্তত তাঁর সাথে ওই অঞ্চলে ঘোরা যায় ও এই ভূমিরূপ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়। সে ছিল আরো এক তপস্যা। ব্রহ্মাই বলেছিলেন "অতি উৎসাহে সমস্ত জলাধারগুলিকে একসাথে মুক্ত করে দিলে বিষম বিপদ ঘটতে পারে। আর এমন কোনো জলাধার মুক্ত কোরোনা, যা তোমাকে সারাবছর জল দিতে পারবেনা। এইজন্য জলাধারগুলির জলের উৎপত্তিস্থলও দেখে রাখা উচিত। যেকোনো একটি বা দুটি জলাধার কে প্রথমে মুক্ত করে শিবের জটার  মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে চালিত করো, তারপরে অন্যান্য জলাধার গুলি থেকে খাল বানিয়ে প্রধান স্রোতের সাথে যুক্ত করো।"

   সকলের উৎসাহ উদ্দীপনা প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে , সবাই ঘরে ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এখন সমতলে গরম হলেও, হিমালয়ের এই অঞ্চলে প্রচন্ড ঠান্ডা। এই দুর্গম উপত্যকার অনুচ্চ পাহাড়ের শৃঙ্গ গুলোতে  বার বার ওঠা নামা করে নকশা তৈরী করতে করতে অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়েছে ও প্রাণ হারিয়েছে । যত উঁচুতে ওঠা যায়, তত ভালোভাবে পুরো এলাকাটি দৃশ্য হয় ঠিকই , কিন্তু কাজটি অত্যন্ত কঠিন।  এর ওপরে আছে হঠাৎ করে আসা তুষার ঝড়, যার কবলে পড়ে ইতিমধ্যেই অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। নিজের সমস্ত রাজকার্য্য ছেড়ে ভগীরথ এই তপস্যায় লেগে আছেন, যার এখনো শেষ হলো না।  আর একমাস পরেই বর্ষা শুরু হয়ে যাবে। হিমালয় পর্বতের বর্ষাকাল বড়ো বিপদজনক।  তখন আর এখানে থাকা যাবেনা। সবাইকে নিয়ে যেতে হবে সমতলের কাছাকাছি। নতুন করে আবার কাজ শুরু করতে হবে শরৎ কাল থেকে শীতকালের আগে পর্যন্ত। ততদিনে এখানকার পাহাড়ের চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। গত দুই বছর ধরে এটাই হয়ে আসছে। 

                                                                      -------------------------------

 
    ভগীরথের জন্মের প্রায় সাতশো বছর আগের কথা। আরাবল্লী পর্বতের পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকে কোশল রাজ্যের অভিমুখে চলেছে এক বিশাল পদযাত্রা। ঘরের জিনিসপত্র,গরু, মোষ, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়ে হাজারখানেক মানুষের সে এক লম্বা মিছিল ................

    রেবতী দুই দিন ধরে দেখছে তার শহরের চেহারা হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়ে গেছে । তার পনেরো বছরের জীবনে সে কাউকে কখনো এমন ম্রিয়মান হয়ে ঘুরতে দেখেনি। পোড়ামাটির ইঁট বসানো রাস্তাগুলি যেন আজ বেশি চওড়া লাগছে। রাস্তায় শুধুমাত্র একটা বা দুটো  গরুর গাড়ি বা হাতে টানা গাড়ি দেখা যাচ্ছে । কেউ আজ আর ব্যস্ত নয়। বাজারও যেন শুনশান হয়ে রয়েছে। অন্যান্য দিন সরস্বতী নদীর বন্দরের দিকে যাওয়ার রাস্তায় এতো ভিড় থাকতো  যে হেঁটে চলা যেতোনা । বন্দরে যাওয়ার রাস্তার পাশে পাশে সীলমোহর  মারার জন্যই কত লোক বসে থাকতো। কাউকে দেখা যাচ্ছেনা।অন্যান্য দিন অনেকগুলি বিদেশী জাহাজ রপ্তানির জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতো, কিন্তু আজ শুধুমাত্র দুটি জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ  তাতে কাপড়, গয়না, বাসনপত্র বোঝাই করছেনা। হয়তো একটু পরে খালি জাহাজগুলিই এখন থেকে শেষ যাত্রার জন্য রওনা দেবে। নদীর পাশের ক্ষেতগুলিতেও কেউ নেই । রাস্তার ধারের বড়ো বড়ো ইঁটের বাড়িগুলি যেন ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

  কয়েক সপ্তাহ আগেও কিন্তু এরকম অবস্থা ছিলোনা। তার বাবা চাষ করার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পরে রেবতী তাদের শহরের বিশাল স্নানাগারে স্নান করে তার মায়ের সাথে গেছিলো গয়না তৈরীর কাজ করতে। বিভিন্ন পাথর দিয়ে তৈরী এই গয়নাগুলি রপ্তানি হতো বিদেশে। ওখানে অনেকজন কাজ করতো। রেবতীর কাজ ছিল ওই পাথর গুলি দিয়ে মালা গাঁথা। ছোটদের জন্য ওই কাজটাই নির্দিষ্ট ছিল। বড়োরা পাথরগুলিকে কাটা  বা পালিশ করার কাজ করতো।

    কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে মুখিয়ার লোকজন এসে খবর দিলো সমস্ত কাজ বন্ধ করে শহরের সভাকেন্দ্রে উপস্থিত হতে। আসলে সেই দিনই রেবতী  বাজারে চারটে আশ্চর্য জন্তুর দেখা পেয়েছিলো। জন্তুগুলো একএক টা বড়োসড়ো গরুর মতো দেখতে হলেও গরুর থেকে অনেক শক্তিশালী এবং প্রচন্ড বেগে দৌড়াতে পারে। মাথাটা উঁচু এবং তার মাথা থেকে ঘাড় পর্যন্ত কি সুন্দর কেশর নেমে এসেছে। এক একটা  জন্তুর পিঠে একটা করে ফর্সা, লম্বা বিদেশী লোক বসে ছিল।  শহরের সমস্ত ছেলেমেয়েরা এবং কিছু বয়স্ক লোকেরাও এই জন্তু দেখার জন্য ভিড় করে তাদের পিছন পিছন চলছিল। বড়োরা বললো এই জন্তুকে ঘোড়া বলা হয়। ওই লম্বা ও ফর্সা লোকগুলি নিজেদেরকে আর্য বলে। রেবতীরা গরু, মোষ দেখলেও ঘোড়া কখনো দেখেনি। কোনো সীলমোহরের ছবিতেও নয়।  আর্যদের কাছে রেবতীর জাতের লোকেরা হলো অসুর। রেবতীদের শহর থেকে অনেকটা উত্তরে গেলে নাকি আর্যদের জনপদ পড়ে। ঘোড়ায় চড়া লোকগুলো মুখিয়ার ঘরের দিকে রওনা হলে মুখিয়ার লোকজন কৌতূহলী লোকেদের  রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো, কাজেই রেবতীও ঘরে চলে গেছিলো।

   শহরের সবচেয়ে বড়ো বাড়িটি হলো সভাকেন্দ্র। সমস্ত শহরের লোক অত্যন্ত উৎসুক ভাবে সভাকেন্দ্রের সামনে  জড়ো হয়েছিল , ভিতরে এতজনের  জায়গা নেই। ঘোড়ায় চড়ে আসা চারজন আর্য কে দেখা গেলো মুখিয়ার সাথে দোভাষীর মাধ্যমে কথা  বলছে। একটু পরে মুখিয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন।

   "বন্ধুগণ, আপনাদের নিশ্চই মনে আছে কয়েক মাস আগের ভূমিকম্পের কথা। আমাদের এখানে এর প্রভাব খুব একটা না পড়লেও, একটা জিনিস অনেকেই লক্ষ্য করেছিলেন এবং আমাকে জানিয়েছিলেন। ভূমিকম্পের এক সপ্তাহের পর থেকেই সরস্বতী নদীর জলস্তর ক্রমশ নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিল। আমাদের এখানে যতই অনাবৃষ্টি হোক না কেন, হিমালয়ের বরফ গলা জলে পুষ্ট এই নদী সর্বদাই পরিপূর্ণ থাকতো। জল কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করার জন্য আমি উত্তরের আর্য জনপদে আমার প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম। আর্যদের জীবনযাত্রাও আমাদের মতো এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাঁদেরও  একই প্রশ্ন ছিল।  ফলে তাঁরাও তাঁদের জনপদের উত্তরদিকে সরস্বতী নদী বরাবর বিভিন্ন আর্য এবং অসুর জনপদগুলিতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। এইভাবে প্রতিনিধিরা হিমালয়ের পাদদেশে দেবলোকে উপস্থিত হন। দেবতাদের কাছ  থেকে তাঁরা জানতে পারেন যে সেই ভূমিকম্পের উৎস ছিল হিমালয়। ভূমিকম্পের ফলে এক বড়োসড়ো ভূমিস্খলন হয়েছে  এবং ফলস্বরূপ  সরস্বতী নদীতে জলের প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে । আর কয়েক মাস পরেই সরস্বতী নদীর আর অস্তিত্ব থাকবেনা।

   আমাদের দুর্ভাগ্য যে এতদিন ধরে গড়ে ওঠা এই শহরগুলি আজ হঠাৎ করে দুর্ভিক্ষর কবলে যেতে বসেছে । জলাভাবে চাষবাস তো বন্ধ হবেই, তার সাথে নদী ও সমুদ্রপথে  সমস্ত বাণিজ্যের রাস্তা বন্ধ হবে । গৃহকর্মের জন্য বা  পান করার জলও পাওয়া দুষ্কর হবে, কারণ এখানে প্রত্যেক বছর বৃষ্টি হওয়া অনিশ্চিত এবং এখানে জমি খুঁড়লে জল পাওয়া যায়না। আমাদেরকে আমাদের বাসস্থান পরিবর্তন করতে হবে।

  সরস্বতী নদীর আশেপাশে বসবাসকারী সমস্ত জনপদের প্রতিনিধিরা একটি সভা করে ঠিক করেছেন কারা  কোনদিকে যাবেন।আমাদেরকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আরাবল্লী পর্বত পার করে পূর্বদিকে কোশল রাজ্যে যাওয়ার জন্য। কোশলরাজ্ সাগর রাজি হয়েছেন আমাদের আশ্রয় দিতে। অসুর অধিকৃত অন্যান্য শহরগুলিকে অন্যান্য জায়গায়, যথা, উত্তরপশ্চিম দিকে পঞ্চনদীর কাছে বা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যে স্থানপরিবর্তন করতে বলা হয়েছে। কিছু জনপদ যাবে পশ্চিম দিকে, সিন্ধু নদীর পাশে । আর্য জনপদগুলি যেখানে খুশি স্থানপরিবর্তন করতে পারে, কারণ বড়ো কোনো বাণিজ্য, চাষ আবাদ বা ঘরবাড়ি না থাকায় তাদের কাছে এই কাজটি করা অত্যন্ত সহজ।

  কোশলরাজ সাগর অত্যন্ত প্রজাপ্রেমী এবং ধার্মিক ব্যক্তি। তিনি আমাদের আশ্রয় দিতে স্বীকার করেছেন। তিনি প্রজাদেরকে সন্তান হিসাবে দেখেন। কোশল রাজ্যে মাটি খুঁড়লে জল পাওয়া যায়। রাজা সাগর প্রজাদের জন্য অনেক জলাশয় খনন করে রেখেছেন। সেখানে আমাদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা যাই হোক না কেন, আমাদের এই শহর এই মুহূর্তে পরিত্যাজ্য। আমাদের হাতে আর সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনারা পূর্বদিকে প্রস্থান করুন।"

    এতো কথা বলে মুখিয়া একটু থামলেন। সভায় গুঞ্জন শুরু হলো।  এই সময়ে এক আর্য ব্যক্তি দোভাষীর কানে কানে কি একটা বললেন। দোভাষী আবার মুখিয়ার কানেও কিছু বললেন।  স্মিত হেসে মুখিয়া বললেন "আমার ধর্ম আপনাদের এই বক্তব্যও আমার প্রজাদের কাছে তুলে ধরা, কারণ আমরা অনেক দিন আগেই আপনাদের প্রভুত্ব স্বীকার করে নিয়েছি।"

    এই বলে প্রজাদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন "আমার আর্য বন্ধু একটি কথা সবাইকে বলতে বলেছেন।  তিনি বলছেন যে আমরা অসুররা নাকি অত্যন্ত বস্তুবাদী, অর্থলোভী এবং বিলাসী। আমরা আর্যদের মতো মাটির কুঁড়েঘর সমন্বিত ছোট ছোট গ্রাম না বানিয়ে পোড়ামাটির ইঁট দিয়ে বড়ো বড়ো শহর সৃষ্টি করেছি। চাষ আবাদ করা, বাণিজ্য করা প্রভৃতি বিলাসিতার লক্ষণ। আমাদের সত্যিই কি এতো সম্পদের প্রয়োজন ? আমাদের লোভ ও মোহ অত্যন্ত বেশি। আমাদের জীবনধারণের জন্য যতটুকু কম সামগ্রী দরকার, সেটুকু নিয়েই আমাদের খুশি থাকা উচিত। মানুষের আসল ধর্ম হচ্ছে ত্যাগ করা, লোভ না করা। এছাড়াও আমরা ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য কখনো যজ্ঞের আয়োজন  করিনা। এরই ফলস্বরূপ ভগবান কুপিত হয়েছেন ও আমাদের এই অবস্থার সৃষ্টি করেছেন।"

 এই বক্তব্য বলার সাথে সাথে স্থানীয় ভাষায় বিভিন্ন মন্তব্য উড়ে এলো।

"আর্যরা আবার বাড়ি বানাতে জানে নাকি ? নিজেরা জানেনা বলে বাড়ি বানানো খারাপ হয়ে গেলো ?"

"ওরা  তো গরু চরাতে  চরাতে  এই দেশে এসে ঢুকেছিলো , আজ যেটুকু চাষবাস করে তাও আমাদের থেকেই শিখেছে  "

"ওদের  বিদ্যা বলতে তো শুধু মুখস্থ করা, তাও আবার না লিখে, শুধুমাত্র শুনে শুনে । লিখতে জানেনা বলে ওরা বলে লেখা পাপ। "

"শুধুমাত্র ঘোড়া ও রথ চালনা করা ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার জন্য ওরা আজ আমাদের প্রভু।"

   শেষ কথাটি কঠোর হলেও সত্যি।  রেবতী মাত্র কয়েকদিন আগে জেনেছে যুদ্ধ কাকে বলে।  এই শহরের বেশিরভাগ লোকই  জানে না যুদ্ধ কেন করে বা কিভাবে করে।  প্রায় একশো  বছর আগে যখন দেবতা এবং আর্যরা উত্তরদিকের সমস্ত উর্বর জমিগুলির দখল নিতে শুরু করেছিল, তখন অসুররা গেছিলো বাধা দিতে। কিন্তু তাদের সাথে যুদ্ধে হেরে ফিরে এসেছিলো । আর্যরা অবশ্য অসুরদের কিছু শহর দখল করলেও, সমস্ত শহরগুলি দখল করেনি। এর কারণ গবাদি পশু ছাড়া অন্য কোনো সম্পত্তির সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই  ছিলোনা, চাষবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য তো দূরের কথা। আর্যদের একটাই শর্ত ছিল, তাদের কথা অনুযায়ী অসুরদের চলতে হবে, এবং চাষবাস বা প্রযুক্তিগত বিদ্যায় আর্যদের সাহায্য করতে হবে।

  যদিও উড়ে আসা মন্তব্যগুলির অনুবাদ করে ওই  আর্যদের কেউ আর বললোনা, কিন্তু রেবতীর মনে হচ্ছিলো আর্যদের কথাগুলি সত্যি। এই যে এত বছর ধরে এই শহর, খেত খামার, ব্যবসা বাণিজ্য সব তৈরি হলো, সব ফেলে রেখে তাদের চলে যেতে হবে একদম খালি হাতে। কি লাভ হলো এত সম্পদ সৃষ্টি করে?

  পদযাত্রায় চলতে চলতে রেবতীর আবার মনে হলো আর্যরাই হয়তো ভালো আছে।  বেশি জিনিসপত্রের বালাই নেই, ঘোড়ায় চড়ে আর গরুগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে কত তাড়াতাড়ি অন্য জায়গায় পৌঁছে যায়।


                                                                 -------------------------------



   - "ওঁ অগ্নয়ে স্বাহা।"
   - "ওঁ সোমাযঃ  স্বাহা।"
   - "ওঁ প্রজাপতয়ে  স্বাহা।"   
     সাগর রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ করছেন। সমবেত কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণে চারিদিক মুখরিত। তাঁর দুই রানী, সুমতি এবং কেশিনী রাজার পাশে বসে রয়েছেন। সুমতির কোনো সন্তান হয়নি, এইজন্য যজ্ঞে বসার অনুমতি নেই, কিন্তু সাগর তাঁর রাজ্যের সমস্ত প্রজাকে সুমতির সন্তান বলে ঘোষণা করেছেন। দূরে একটি তরতাজা ঘোড়া বাঁধা রয়েছে।  রাজা  নিজে অত্যন্ত ধার্মিক, প্রজারঞ্জক হওয়া সত্ত্বেও নিজের প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞের আকর্ষণ আর উপেক্ষা করতে পারেননি । ভেতরে ভেতরে আরো ইচ্ছা, উত্তরদিকে দেবতাদের রাজ্যকেও দখল  করা।এদিকে গত দশ  বছর ধরে কোশল রাজ্যে ভালোভাবে বৃষ্টি হয়নি, ফলে ভালো চাষ আবাদও হয়নি। জল পাওয়ার জন্য এখন জমিতে অনেক গভীর পর্যন্ত খনন করতে হয়। প্রজারা দুর্ভিক্ষের  শিকার। এর ওপর শুরু হয়েছে সরস্বতী নদীর আশেপাশের জনপদগুলির থেকে শয়ে শয়ে অসুর জাতির লোকের আগমন। অনেকেই রাজাকে  এখন এই যজ্ঞ করতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু এই যজ্ঞ না করলে নাকি তাঁর আর সম্মান থাকবেনা, আর তিনি মনে করেন  যজ্ঞ করলেই ভগবান  সন্তুষ্ট হবেন এবং সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। এমনকি তাঁর নিজের একমাত্র সন্তান, কেশিনীর ছেলে অসমঞ্জস এই যজ্ঞের প্রতিবাদ করায় তাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। কিন্তু একমাত্র নাতি, পনেরো বছরের অংশুমানকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।

    অসুরদেরকে নিজের রাজ্যে আহ্বান করার মধ্যে অবশ্য সাগরের অন্য স্বার্থও ছিল। এই জাতির লোকেরা অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী। এরা স্থাপত্য বিদ্যায়ও অনেক অভিজ্ঞ। মুনি ঋষিরা পরামর্শ দিয়েছিলেন "ওসব অশ্বমেধ যজ্ঞ টজ্ঞ না করে, এদেরকে দিয়ে নিজের রাজ্যের উন্নতি করাও। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, জলাশয় প্রভৃতি তৈরি করাও।" রাজা তা তো করবেনই , কিন্তু যজ্ঞও করবেন।

  কোশল রাজ্যের দক্ষিণপূর্বে আছে এক সুবিশাল অনুর্বর রুক্ষ জমি, যা খনন করলেও জল পাওয়া যায়না।  আরো পূর্বদিকে "রাজমহল" এলাকায় আছে কতগুলি ছোট ছোট আগ্নেয়গিরি। আগ্নেয়গিরি গুলি এখন সুপ্ত হলেও এর প্রভাবেই এই জমি এখনো রুক্ষশুক্ষ হয়ে পড়ে আছে।  এর ঠিক দক্ষিণপূর্ব দিকেই  শুরু হয়েছে "বঙ্গ" নামের এক সুবিশাল জলাভূমি।দক্ষিণদিকের সমুদ্র এই জলাভূমির অর্ধেকের বেশি গ্রাস করে রেখেছে।  রাজা অনেক হিসাব করে জলাভূমির পশ্চিম দিকের অনুর্বর অংশটি অসুরদেরকে ছেড়ে  দিয়েছিলেন। জলাভূমির নোনতা জল চাষের অনুপযুক্ত হলেও তাঁর আশা ছিল কোনো রকম উপায়  বার করে কিছু কিছু চাষবাস এখানে শুরু করা যাবে।

  ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হলো। সাথে সাথে চললো সৈন্যদল। কিন্তু কয়েকদিন চলার পরেই সৈন্যের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলো। দুর্ভিক্ষের ফলে অত্যন্ত কষ্ট করে তাদের সংসার চলছে । রাজার আহ্বানে নেহাত বাধ্য হয়ে তারা ঘোড়ার সাথে চলতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু কারোর মধ্যেই যুদ্ধ করার মতো ইচ্ছে বা মানসিকতা ছিলোনা। ফলে ঘোড়া ছাড়ার দুই সপ্তাহ পরেই ঘোড়াটি সম্পূর্ণ একলা উত্তরদিকে দেবলোক অভিমুখে চলতে শুরু করলো। সাগর দেবতাদের রাজ্য দখল করবেন এই আশংকায় দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর কিছু অনুচরকে আগেই বলেছিলেন ঘোড়াটিকে সব সময়ে অনুসরণ করতে । ঘোড়াটি একলা ঘুরছে শুনে ইন্দ্রর মাথায় একটি বুদ্ধি  খেলে গেলো।

   রাজমহল অঞ্চলেই রয়েছে কপিল মুনির আশ্রম। সাগর রাজা মুনি ঋষিদের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তি করেন। ইন্দ্র ঘোড়াটিকে মুনির আশ্রমে নিয়ে গেলেন। দেবরাজ ইন্দ্রকে হঠাৎ তাঁর আশ্রমে দেখে মুনি খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কিন্তু ইন্দ্র, সাগর রাজার  দেবলোকে অভিযানের পরিকল্পনার কথা সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে তাঁর অশ্বমেধ যজ্ঞ করা ও তার অসারতা নিয়ে খানিক্ষন কথা বললেন। কথার চাতুরীতে কপিল মুনিকে প্রত্যয় করিয়ে ছাড়লেন যে সাগরের এখন প্রথম কাজ সারা রাজ্যে জলের ব্যবস্থা করা। এর পরে অন্য কিছু করা উচিত। ইন্দ্র বললেন "ঘোড়াটিকে এখন আপনার কাছে রেখে দিন, সাগর সন্ধান করতে এলে তাঁকে বুঝিয়ে বলুন। আপনি বললে তিনি নিশ্চই বুঝবেন।"

  কিছুদিন পরেই শুরু হলো খোঁজ খোঁজ, ঘোড়া কোথায় গেলো। অংশুমান কে পাঠানো হলো খোঁজ করার জন্য। অনেক খোঁজ করে অংশুমান ঘোড়াটিকে  পেলেন কপিল মুনির আশ্রমে। কিন্তু কপিল মুনি ছাড়বার পাত্র নন।  অংশুমানকে বললেন সাগর তাঁর সাথে দেখা না করলে ঘোড়া ফেরত দেওয়া যাবেনা।

  সাগর ব্যস্তসমস্ত হয়ে কপিল মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। মুনি অনেক্ষন ধরে সাগরকে বোঝালেন এই দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিতে রাজ্যে জলের ব্যবস্থা করা কতটা জরুরি। সরস্বতীর অববাহিকা থেকে দলে দলে অসুররা এই রাজ্যে উপস্থিত হওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে।  অবশেষে সাগর বুঝলেন। কিন্তু উপায় কি ? তখন নদী খনন করার পরামর্শটা কপিল মুনিই দিলেন।

  হিমালয়ের আশেপাশের এলাকায় বসবাসকারী দেবতাদের কাছ থেকে কপিল মুনি একসময়ে হিমালয়ে অবস্থিত বিভিন্ন জলাধার ও হিমবাহর কথা শুনেছিলেন । দেবতাদের অনেকেই বলতেন সেখানে নাকি এমন সুবিশাল হিমবাহ আছে, যার বরফ গলা জল কখনো শেষ হওয়ার নয়। মুনি বললেন "এই জলকেই তোমার রাজ্যে প্রবাহিত করার চেষ্টা করো। সকলের মঙ্গল হবে। জন্ম জন্মান্তর ধরে তোমার নাম অমর হয়ে থাকবে।"  

    শুরু হলো এক বিশাল প্রকল্প।  হিমালয় পর্বতের থেকে নদী  কেটে সমতলে এনে  কেটে সারা রাজ্যে জলপ্রবাহের ব্যবস্থা করা। প্রায় ষাট হাজার খননকারীকে এই কাজে লাগানো হলো। স্থির করা হলো নদীকে রাজ্যের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত করে রাজমহল অঞ্চল দিয়ে নিয়ে গিয়ে দক্ষিণের জলাভূমিতে ছেড়ে দেওয়া হবে।

    যথারীতি কাজ  শুরু হলো। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রাজ্যের কেন্দ্র থেকে রাজমহল পর্যন্ত খনন শুরু হলো।  কিন্তু বিধি বাম। রাজমহল অঞ্চলে খননকার্য চলার সময়ে ওই অঞ্চলের এক আগ্নেয়গিরী হঠাৎ করে অগ্নুৎপাত শুরু করলো। খননকারীরা সকলেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন। এই ঘটনায় সারা রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এলো।  প্রজারা  বলতে শুরু করলো, এই নদীর কাজ শেষ না হলে রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মার শান্তি হবেনা। তাই কাজ আর বন্ধ হলোনা।কিন্তু রাজা তাঁর জীবদ্দশায় কাজ শেষ করেও যেতে পারলেননা।

    সাগরের মৃত্যুর পরে অনেক যোগ্য অযোগ্য রাজা এলেন। কেউ কাজকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গেলেন, কেউ কোনো কাজই করলেননা। ভগীরথ এঁদেরই সপ্তম বংশধর।
           
                                                                        -------------------------------

     পাখির কলকাকলিতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো।  ভগীরথ পাথরে বসে বসেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন বুঝতে পারেননি।  সকাল হয়ে  গেছে।  দূরের দিকে চোখ পড়লো। ভগীরথের গুহার দিকে তিনজন  আসছে।  

    ওটা মনিভদ্র না ! এতো সকাল সকাল ? সাথে দুইজন স্থানীয় কীরাত জাতির লোক রয়েছে দেখা  যাচ্ছে। মনিভদ্র হলেন এই নদী বানাবার প্রকল্পের প্রধান তত্বাবধানকারী , ভগীরথের ডানহাত।  অসুর জাতির এই লোকটিকে ভগীরথ অত্যন্ত পছন্দ করেন। রাজা সাগরের সময়ে সরস্বতী অববাহিকা থেকে কোশল রাজ্যে আসা অসুররা বংশপরম্পরায় তাদের নির্মাণকার্যের দক্ষতাকে এমন ভাবে বিকশিত করেছে যে বর্তমানে তাদের ছাড়া এতো বড়ো প্রকল্পের কথা ভাবাই  যায়না। আর্য জাতির লোকেরা আজও শুধুমাত্র কৃষি ও যুদ্ধবিদ্যাতেই দক্ষ। 
- "প্রণাম মহারাজ।"
-"কি খবর মনিভদ্র ? দেখে মনে হচ্ছে কোনো ভালো খবর এনেছো ? তোমার সাথে এরা কারা ?"
-"এনারা হলেন কুম্ভ এবং সুবাহু। আমাদের তৈরী করা নকশা নিয়ে আমি কাল এনাদের গ্রামে গেছিলাম আরো কিছু তথ্য নিতে। এনারা আমাকে গঙ্গা নামের এক সুবিশাল সরোবরের কথা বললেন। এই পর্বতের একটু উত্তরপশ্চিমে গেলে এই সরোবর টি দেখা যাবে। এই সরোবরের জল সর্বদাই পরিপূর্ণ থাকে গঙ্গোত্রী নামের একটি হিমবাহের থেকে আসা  জলে।  আমরা এটি দূর থেকে দেখলেও এর জলের উৎসটিকে বুঝতে পারিনি।এনাদের গ্রামের কিছু লোক এই উৎসটি দেখে এসেছেন "
-"খুব ভালো খবর।  আমরা আজকেই এটিকে দেখার জন্য যাত্রা করতে পারি কি?"
-"নিশ্চই মহারাজ, আজকের আবহাওয়াও ভালো, সন্ধের মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছে যেতে পারি।"
   
   যা কথা তাই কাজ। অন্যান্য লোকজন তাদের তাঁবুতেই রয়ে গেলো। শুধুমাত্র চারজন রওনা হলেন গঙ্গাসরোবর  কে চাক্ষুস দেখতে। 
    
   সরোবরের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একটু রাতই হয়ে গেলো। কিন্তু সেখানে পৌঁছে ভগীরথের মনে হলো যেন চোখ সার্থক হয়ে গেলো। তিনি ভাবতেই পারেননি এই অঞ্চলে এতো বড়ো সরোবর রয়েছে।  চাঁদের আলোতে সরোবরটি ঝলমল করছে এবং মাঝে মাঝেই জানান দিচ্ছে জলে বিবিধ জন্তুর বসবাস। এখানে পৌঁছাবার সাথে সাথেই তিনি কুমির দেখেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে মাছ ছাড়াও জলে আছে বিভিন্ন রকম সাপ,কচ্ছপ ও অন্যান্য জন্তু। এতো জন্তুর অবস্থানও প্রমান করছে এই জল কখনো কমে যায়না।  
   
    ভগীরথ সিদ্ধান্ত  নিয়ে নিলেন। এই সরোবরটিকেই  মুক্ত করতে হবে। রাতের জন্য এখানেই তাঁবু খাটানো হলো। সকালেই খবর পাঠানো হলো খননকারীদের। কয়েকদিন পরেই কাজ শুরু হয়ে গেলো। 

   একমাস হয়ে গেলো। আজ সবাই যেন একটু বেশি উৎসাহিত। পরিকল্পনামত একটুখানি জায়গাই খনন করার ছিল।  মনিভদ্রর হিসাব অনুযায়ী এই খালের শেষ অংশ থেকে পরবর্তী খালের মুখটি অনেক দূরে হলেও সেই দূরত্বটি ক্রমশ দক্ষিণে ঢালু হয়ে গেছে। ফলে গঙ্গা তার নিজের স্রোতেই এই শিবের জটার মতো পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণের খালে উপস্থিত হবে। আশেপাশের গ্রাম থেকে দেবতা, যক্ষ, গন্ধর্ব জনজাতির লোকেরা জড়ো হয়েছে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য। দেবলোক থেকে ভগীরথের প্রধান পরামর্শদাতা ব্রহ্মাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।তিনিও  এসেছেন। সূর্য ডুবে গেছে অনেক্ষন হয়েছে। অতি উৎসাহে শ্রমিকরা আজ আর কাজ বন্ধ করেনি। আকাশে তৃতীয়ার চাঁদ দেখা যাচ্ছে।  অবশেষে উপস্থিত হলো সেই মুহূর্ত। গঙ্গা সরোবর সরাসরি যুক্ত হয়ে গেলো  খনন করা ছোট খালটির  সাথে।

     খাল এর থেকে সরোবরের উচ্চতাটা অনেক। সরোবরের ধারের একটুখানি জায়গায় খোঁড়া হলেও জলের চাপে সেটি ক্রমশ বড়ো হতে শুরু করলো। ভগীরথ শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে অনেক আগেই নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছিলেন। উৎসাহী দেবতা ,দানব ও অন্যান্য দর্শকরাও অনেক দূরের থেকেই এই দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। একটু পরেই জলের প্রচন্ড চাপে সরোবরের খোঁড়া অংশটি সম্পূর্ণ রূপে ভেঙে পড়লো। প্রচন্ড গর্জনের সাথে এক সুবিশাল জলস্রোত সামনের সবকিছু গ্রাস করে নিয়ে জলজ জীবজন্তু সহ এগিয়ে চলতে শুরু করলো । রাতের অন্ধকারে সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য।বড়ো বড়ো মাছ ও শুশুক যেন আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। অগুনতি সাপ ও কচ্ছপ জলের সাথে বয়ে চলেছে।  পরিষ্কার আকাশের থেকে আসা তৃতীয়ার চাঁদের স্বল্প আলোতেও এই সুবিশাল জলস্রোত যেন আলোয় ঝলমল করে উঠেছে ।ভগীরথ গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। এতদিনের চেষ্টা সম্পূর্ণ হয়েছে।

       চারিদিক থেকে আওয়াজ উঠলো "সাধু , সাধু !" "মহারাজ ভগীরথের জয় !" ভগীরথ ভেবে পাচ্ছেননা মনিভদ্র ও অন্যান্য শ্রমিকদের তিনি কি বলে ধন্যবাদ দেবেন। হঠাৎ মনিভদ্রের আওয়াজ পাওয়া গেলো "এই নদীর আরেক নাম হোক ভাগীরথী। আমাদের রাজা অমর হয়ে থাকবেন।" আবার আওয়াজ উঠলো "সাধু ,সাধু ! জয় ভাগীরথীর জয় !" ব্রহ্মা ধীরে ধীরে ভগীরথের কাছে এসে বললেন "মহারাজ, আপনার তপস্যা সার্থক। আপনার কল্যানে এই দেশ একটি নতুন নদী পেলো। আজকের দিন সবার কাছে অক্ষয় তৃতীয়া নামে পরিচিত হবে।"
   
      মনিভদ্র একটু দূরে দাঁড়িয়ে পরবর্তী কর্তব্য স্থির  করছিলেন। এই প্রচন্ড স্রোত তো কয়েক ঘন্টা পরে কমে যাবে। নদীটি স্রোতের দ্বারা তার গতিপথও নির্ধারণ করে নেবে। কিন্তু এর পরে কি হবে ? গঙ্গা নদীতে সারা বছর জল হয়তো থাকবে, কিন্তু জলের পরিমান কতটা হবে ? কাল থেকে গঙ্গার স্রোতের অভিমুখে সমস্ত শ্রমিকদের নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে। প্রথম কাজ হবে অন্যান্য ছোট ছোট জলাধারগুলি থেকে আরো কিছু খাল কেটে গঙ্গার সাথে যুক্ত করা।  এছাড়াও নদীর প্রবাহপথের মাঝে কোনো বাধা থাকলে তাকেও অপসারণ করতে হবে।

     বাধাটা এলো জহ্নু পাহাড়ের কাছে। পাহাড়ের আকারটি যেন কোনো শায়িত ব্যক্তির  উঠিয়ে রাখা জানু। এইজন্য এই পাহাড়ের নাম জহ্নু। বেশ কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত। ভগীরথ, মনিভদ্র ও অন্যান্য শ্রমিকেরা নদীটিকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে ও অন্যান্য খালগুলির কাজ সম্পূর্ণ করতে করতে  ফিরছিলেন।  পাহাড়টি একটু দূরেই  দেখা যাচ্ছে, কিন্তু গঙ্গা নদীর কোনো চিহ্ন নেই।  এটি যেন হঠাৎ করে পাহাড়ের কাছে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। সকলেই আশ্চর্য হয়ে গেলো । এতো জল কোথায় গেলো ? মনিভদ্র গেলেন পাহাড়টিকে পর্যবেক্ষণ করতে। কয়েকদিন পরে তিনি ফিরলেন। জানা গেলো ওই পাহাড়ে আছে এক বিশাল গহবর।  ওপর থেকে দেখে বোঝা যায়না, কিন্তু এটি এই পাহাড়ের ভিতরে ভিতরে এক বিশাল জায়গা অধিকার করে আছে। মনিভদ্র হাসতে হাসতে বললেন "গঙ্গাকে আবার এই জহ্নু মুনির হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।"
     
     আবার কাজ শুরু হলো , তবে এবার কোনো অনিশ্চিত ফলের অপেক্ষায় নয়। এটা নিশ্চিত যে এতটা জল পাহাড়ের গহবরে বেশিদিন থাকতে পারবেনা। একটাই কাজ, পাহাড় ও তার গহবরের মাঝের সবচেয়ে দুর্বল স্তরটি খুঁজে বের করা।  এটিকে কোনোভাবে উন্মুক্ত করতে পারলেই জল তার নিজের চাপে বাইরে চলে আসবে ও পাহাড়ের ওই অংশটিকে হয়তো ভেঙেও ফেলবে। মনিভদ্রর সুদক্ষ পরিচালনায় এই কাজটিও সম্পূর্ণ হলো।  গঙ্গা নদী  পাহাড়টিকে ভেঙে বেরিয়ে এলো। মনিভদ্রর শ্রমিকেরা নদীর নতুন নামকরণ করলো, "জাহ্নবী।"



    ভগীরথের সৌভাগ্য, এরপরে আর কোনো বাধা এলোনা। নদী তার নিজের গতিতে কোশল রাজ্য অতিক্রম করে রাজমহল অঞ্চলের রুক্ষ সুক্ষ জমিকে সুশীতল করে তুললো। সাগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মার এতদিনে যেন শান্তি হলো। কোশল রাজ্যের প্রজারা দুহাত তুলে ভগীরথকে আশীর্বাদ করলেন। সৃষ্টি হলো উত্তর ভারতের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ নদীর। সরস্বতী নদী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তার অববাহিকায় বসবাসকারী জনজাতি, যারা প্রায় সাতশো বছর আগে কোশল রাজ্যের অভিমুখে রওনা দিয়েছিলো, কিছু সবুজ কৃষিজমির সন্ধানে, তাদের কাছে গঙ্গা নদী যেন বরদান হয়ে উপস্থিত হলো। ভবিষ্যতের প্রজন্ম বিভিন্ন গল্পকথার মধ্যে দিয়ে ভগীরথকে অমর  করে রাখলো  । গঙ্গা নদীর আশেপাশের লোকজন আজও কঠিন তপস্যা বলতে ভগীরথের তপস্যাকেই বোঝেন। 



Comments

  1. A very convincing interpretation of our popular mythologies though at times a bit to ambitious. How far it would have been possible for engineers in early iron age to achieve such Herculean feat...I am not very sureof. Anyways literature allows us to think big. Your writing style is very fluid, the flow of language is spontaneous and the information you have added is not a burden to the writing. Do carry on writing, I am looking forward to your next story.

    ReplyDelete
  2. Mythology interpreted in simple language. Loved it Santu kaku

    ReplyDelete
  3. বেশ ভালো লাগল ।

    ReplyDelete
  4. Very beautifully written Santu Kaku. Looking forward to many more. :)

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

The story of Ganga

A Management and political lesson from the Ramayana

The revenge - প্রতিশোধ