Story - Hay prem

হায় প্রেম 

সুব্রত ভট্টাচার্য


   ঠিক পৌনে ৯ টা  বাজে। আজ একদম ঠিক করে রেখেছি, আমি যখন বাস স্টপ থেকে ৫-৬মিটার দূরে থাকবো , তখন সাদা নীল বাস টা মিস করতে হবে।  শুধু একটু দৌড়াবার ভান করলেই হবে।  লাল সবুজ বাস টা এর ঠিক ৫ মিনিট পিছনে থাকে। হাতে মাত্র ৫ মিনিট সময়, এর মধ্যে যা বলার বলতে হবে, তাকে বাস স্টপ এ দাঁড় করিয়ে রেখে । মুশকিল হলো দুটো বাস দুই দিক থেকে আসে।  একটা আসে কদমা থেকে, আরেকটা আসে সাকচি থেকে। দুটোই আদিত্যপুরে আমার কারখানার পাশ দিয়ে যায়। সে নামে কদমার বাস থেকে। নেমে আমার বাস স্টপ এর কাছেই একটা কারখানা আছে, তার গেট দিয়ে ঢুকে যায়। যদি পরের বাস টা আগে চলে আসে, তবে আমার কারখানায় যেতে দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু তা হোক, আমি আজকে যাকে বলে মরিয়া হয়ে গেছি। বেশ একটা করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে ভাব।  জীবনে কিছু বৈচিত্র চাই, সব একদম নিরামিষ হয়ে গেছে। 

০০০০০০০০০০

    বেশ কয়েক বছর হলো জামশেদপুর এ রয়েছি। কয়েকজন বাঙালি বন্ধু মিলে ঘর ভাড়া করে থাকি। নিজেরাই রান্না করে খাই।  সবাই বিভিন্ন কারখানায় কাজ করি, একেবারে সাদামাটা জীবন। আশ্চর্য ব্যাপার হলো কারোরই কোনো মেয়ে বন্ধু নেই। সবাই মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার কিনা, তাই হয়তো। ফোন বলতে Nokia 3310, আর মেয়েদের সান্নিধ্য বলতে মাঝে মাঝে বিষ্টুপুরে "অমর মার্কেট" এ ঘুরে আসা। বাজার টা বেশ ঘিঞ্জি।  আমরা বলি চল ওড়নার হাওয়া খেয়ে আসি।  তখনও  জিন্স আর টপ এর এতো চল হয়নি।

       আমাদের শুভ দা অনেকদিন ধরেই আমার পিছনে লেগে রয়েছে, "ব্যাটা তিরিশ বছর বয়স হয়ে গেলো, কারোর সাথে প্রেম করতে পারলিনা !! তুই এতো কাঠখোট্টা কেন রে ? শেষে বাবার পছন্দ করে দেওয়া মেয়েকেই বিয়ে করবি?" আসলে তখন আমার বিয়ের সম্বন্ধ দেখা চলছে। জামশেদপুরের একটা মেয়ে কে আমার বাবা মা পছন্দ করলেও আমি ভবিষ্যতে রাজকন্যা পাওয়ার  আশায় তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি।

      সত্যি বলতে কি আমার কলেজ জীবনও  একরকম রুক্ষ সুক্ষই ছিল।  মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ কোনো মেয়ে পড়তো না। ফলে আমরা খালি "নীলাঞ্জনা " আর "রুবী রায়" গান করেই সন্তুষ্ট থাকতাম। তবে আমার বেশি পছন্দ ছিল "ও গো নিরুপমা।"

       যখন শুভ দা, রাজীব, সবাই নিয়মিত ভাবে প্রেম করার জন্য উৎসাহ দিতে শুরু করলো, তখন একবার  বাসে করে আসা এই মেয়েটির কথা বেফাঁস বলে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি যে বাসে করে রোজ অফিস যাই, সেই বাস থেকে একটি মেয়ে রোজ নামে, আর আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

     তার পর থেকে আমার প্রায় জীবন দুর্বিসহ অবস্থা। না, প্রেমে পড়ার জন্য নয়, সবাই উঠে পড়ে আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য।আসলে প্রেম জিনিস টা আমার আসেনা বললেই চলে। তবুও প্রত্যেক দিন একই প্রশ্ন, "কি রে আজ কথা বললি ? " জবাব দিতে দিতে নাজেহাল অবস্থা।
   
    অবশেষে ঠিক করে ফেললাম, যেমন করে হোক কথা বলবোই। শুধু কথা বলার জন্য থাপ্পড় তো মারতে পারবে না !

০০০০০০০০০০
   
     ওই তো বাস এসে গেছে। ও নামলো। নীল রঙের সালোয়ার কামিজ এ খুব সুন্দর লাগছে। সব সংকোচ ঝেড়ে ফেললাম।
- "গুড মর্নিং , থোড়া  বাত করেঙ্গে ?"
- "হাঁ  বোলিয়ে ?"
- "ম্যায় রোজ আপকো ইধার সে যাতে হুয়ে দেখতা হুঁ , আজ সোচা থোড়া বাত কর লেতা হুঁ। মেরা বাস ভি মিস হো গয়া "
- হ্যাঁ বলুন না !
এই রে ! আমার উচ্চারণ শুনে বুঝে ফেলেছে আমি বাঙালি। ভাগ্যক্রমে সেও বাঙালি। জামশেদপুরে বাংলা ,হিন্দী  দুটো ভাষাই প্রায় সমান ভাবে চলে। কিন্তু আমি তো আর কথা খুঁজে পাচ্ছি  না।
-" ইয়ে মানে আপনি কি এখানেই কাজ করেন ?"
-"হ্যাঁ , চলুন না গেট অব্দি যেতে যেতে কথা বলি।"
-"ঠিক আছে চলুন।"
উৎসাহে বুক ঢিপ ঢিপ , অফিস যাওয়া ?  গোল্লায় যাক !
- "আপনার নৌকা ঠিক জায়গায় ভিড়লো না মনে হচ্ছে।"
বাবারে  ! এই রকম বাংলা ? এ তো কলকাতার লোকেরা বলে।মেয়েটা সাংঘাতিক স্মার্ট মনে হচ্ছে।
- "মা- মানে ?"
- "মানে হচ্ছে এই, যে আমি বিবাহিত। আমার একটি ক্লাস টু এ পড়া মেয়ে আছে।"
আশ্চর্য, মেয়েরা কি করে মনের কথা এইভাবে বুঝে ফেলে, তা আজও আমার বোধগম্য হলোনা।
কিন্তু শেষে এই জবাব ? কেন জানিনা তখন আমার অবচেতন মনে বিবাহিত মানে, শাড়ি এবং শাঁখা, সিঁদুর বা মঙ্গল সূত্র পড়া মেয়ের কথাই মনে হতো।এরকম সাজ পোশাক  আমি ভাবতেই পারিনি। সময় কত পরিবর্তনশীল!! নিজের অভিব্যক্তি যতটা সম্ভব চাপার চেষ্টা করলাম।
-  "না আমি সেরকম কিছু ভাবিনি। রোজ আপনাকে দেখি, তাই ভাবলাম একটু পরিচয় করি।  আমরা তো বন্ধুও হতে পারি ?"
-"নিশ্চই, তবে আমার কারখানার গেট এসে গেছে, আজ চলি ? কাল কথা হবে !"
-"ওকে, গুড বাই !"
এরপর ? এরপর আর কি ? বেশ ফুরফুরে মেজাজে আবার বাস স্টপ এ গেলাম। আজকে বন্ধুদের বলার জন্য একটা গল্প তৈরী হয়ে গেলো। পরের বাসটাও পেলাম না।  অনেক পরে আরেকটা বাস ধরে লেট করে অফিস পৌঁছালাম। এরপরে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়াই ছেড়ে দিলাম।পরে একটা মোটরসাইকেল  কিনে ফেললাম, আর তাতেই অফিস যাওয়া শুরু  করলাম।

      পরিশেষে জানাই আমার বিয়ের আগে কোনো প্রেমিকা কে আমার বাইক এর পেছনে বসাবার সৌভাগ্য আর হয়নি। আমার সম্বন্ধ করে বিয়ে করা বউই এই সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যর অধিকারী।

Comments

Popular posts from this blog

The story of Ganga

A Management and political lesson from the Ramayana

The revenge - প্রতিশোধ