Story - Jonmokotha-the birth of Krishna
জন্মকথা
সুব্রত ভট্টাচার্য্য
সূর্যদেব সবে অস্তাচলে যেতে শুরু করেছেন।
মথুরা নগরীর উপকন্ঠে যমুনা নদীর ধারে গোবর্ধন পাহাড়ের নিচে তিন ব্যক্তি গভীর আলোচনায়
মগ্ন । দুই বন্ধু নন্দ এবং বসুদেব পরামর্শ করছেন দেবলোক থেকে আগত নারদ গোত্রের এক
মুনির সাথে।অদূরে ক্রীড়ারত গোচারণ করাতে আসা কিছু রাখাল বালক। কিছু হৃষ্টপুষ্ট
গাভী মনের আনন্দে ঘাস খেতে ব্যস্ত। এই স্থানটি গোকুল নামে পরিচিত। নন্দ এই গ্রামের
নির্বাচিত প্রধান। মথুরার রাজাকে তিনি নিয়মিত খাজনা দিয়ে থাকেন। মথুরার বর্তমান
রাজা কংস। নিজের পিতা উগ্রসেন কে কারারুদ্ধ করে তিনি সিংহাসন দখল করেছেন।
বসুদেব এবং নন্দ অনেক দিন থেকেই মথুরা কে
কংসের কুশাসন থেকে রক্ষা করার জন্য দেবলোকের দেবতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে
চলছিলেন।বর্তমানে আর্যাবর্তে অনেক স্বাধীন জনপদ, নগর, রাজ্য , প্রতিষ্ঠা হলেও
সবাই দেবতাদের আধিপত্য নির্বিবাদে স্বীকার করেন। এর প্রধান কারণ দেবতাদের ক্ষমতা ।
দেবতারা আজও বুদ্ধিমত্তা, যুদ্ধক্ষমতা,
যন্ত্রবিদ্যা, স্থাপত্ববিদ্যা প্রভৃতিতে ভারতবর্ষর সমস্ত
রাজ্য থেকে অগ্রসর । যুদ্ধবিদ্যায় দেবতাদের নারী, পুরুষ সকলেই সমান ভাবে পারদর্শী। ভারতবর্ষে
আর্য জাতির জন্য বিভিন্ন জনপদ ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার পিছনে দেবতাদের, বিশেষ করে তাঁদের প্রধান মার্গদর্শক ব্রহ্মার
অবদান অনেক। এইজন্য ব্রহ্মাকে তাঁরা প্রজাপতিও বলেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে নগর
সৃষ্টি করা, বিভিন্ন নদীর
গতির অভিমুখ পরিবর্তন করে বা খাল কেটে জলকে নিয়ন্ত্রণ করে কৃষির কাজে লাগানো
প্রভৃতি ব্যাপারে সঠিক পরামর্শের জন্য দেবতারাই সহায়, যদিও আর্য জাতির জন্য দেবতাদের একটু বেশিই
পক্ষপাতিত্ব আছে । তাঁরা কোনো রাজ্যের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ না
করলেও নিজেদেরকে সমস্ত আর্যাবর্তের ধর্ম বা জীবনশৈলী , সমাজ, ন্যায়, নীতির রক্ষাকর্তা
হিসাবে মনে করেন। হিমালয়ের পাদদেশে
একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তাঁরা তাঁদের রাজ্য “দেবলোক” সৃষ্টি করেছেন। এই রাজ্যের রাজধানী অমরাবতী। তাঁদের রাজা বা ইন্দ্র কে নির্বাচিত করেন সেই রাজ্যের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি। কেউ এখানে বংশানুক্রমে ইন্দ্র
হতে পারেন না। আর্য জনগোষ্ঠীর রাজারা কখনো
কখনো তাঁদের সন্তান কে দেবতাদের কাছে পাঠিয়ে থাকেন যুদ্ধবিদ্যা ও অন্যান্য বিদ্যায়
পারদর্শিতা অর্জনের জন্য। দেবতারা যখন জঙ্গল পরিষ্কার করে বিভিন্ন রাজ্য বা জনপদ প্রতিষ্ঠা
করছিলেন, সেই সময়ে জঙ্গলে বসবাসকারী রাক্ষস, অসুর, নাগ প্রভৃতি কিছু উপজাতি দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
করেছিল । কিছু অসুর সরাসরি দেবতাদের রাজ্যও আক্রমণ করেছিল। তারা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে দেবতাদের
প্রায় পরাস্ত করলেও দেবতাদের কিছু বীরাঙ্গনা মহিলা যোদ্ধা বিভিন্ন কৌশলের দ্বারা অসুরদের কে পরাস্ত করতে সমর্থ হন। বর্তমানে অসুর
এবং নাগ জনগোষ্ঠীর কিছু উপজাতি দেবতাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেন। আর্যদের সাথেও
কিছু উপজাতির সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।
যাইহোক ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের ও দেবতাদের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি করেন নারদ
গোত্রের মুনিগন। এই মুনিরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করেন এবং প্রত্যক্ষ
বা পরোক্ষ ভাবে সেই রাজ্যের রাজনীতিকে দেবতাদের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। ক্ষুরধার এবং কুটিল রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা এঁদের
বৈশিষ্ট। এঁদের দূরদৃষ্টি অসাধারণ । দরকার হলে এঁরা যেকোনো রাজ্যের রাজা কে
উৎপাটিত করে অন্য রাজা কে সিংহাসনে বসাবার ক্ষমতা রাখেন।ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রাজা
ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, দেবতাদের সাথে
সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এঁদের কে সমীহ করে চলেন ।
আমাদের গল্পের তিন ব্যক্তির আপাতত
আলোচনার বিষয়বস্তু রাজনীতি। মথুরা রাজ্য শাসন করেন কংস। তাঁর দুর্নীতি ও অসামাজিক কাজকর্মে
প্রজারা অতিষ্ঠ । নিজের বোন দেবকীর সাথে বিবাহের সম্বন্ধ করার
অছিলায় তিনি অনেক বার বসুদেবের ঘরে যাওয়া আসা করেছেন। বসুদেবের প্রথম স্ত্রী
রোহিনী কে তিনি নানাভাবে উত্তক্ত করে তুলেছিলেন। বসুদেব বাধ্য হয়েছেন তাঁর প্রথম
স্ত্রী কে কংসের কুদৃষ্টি থেকে সরিয়ে বন্ধু নন্দের কাছে রাখতে।
------------------oooooooooooo-------------------------
-"হে দেবর্ষি আপনি
এ কি কথা বলছেন ? এও কি সম্ভব ?" বলে উঠলেন বসুদেব।
-"কেন সম্ভব নয় ? আপনার রাজ্যের মঙ্গলের জন্য এই আত্মত্যাগ আপনি
করতে পারবেন না ?" বললেন নারদ।
-" হে মুনিবর, নিজের দেশকে রক্ষা করার জন্য আমি আমার
জীবনত্যাগ করতে প্রস্তুত, কিন্তু প্রায় সাত
বছর ধরে এতবড়ো চক্রান্তের অংশীদার হওয়া আমার পক্ষে একটু কঠিন বলে মনে হচ্ছে। এই
কাজের জন্য সাত সাত টি সন্তান কে জন্ম দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার কি কোনো
দরকার আছে ? আর দেবকী ? তার কি হবে ? আমি আমার প্রথম সন্তানকেই জন্মের পরে দেবলোক
পাঠিয়ে তাকে সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী করে নিয়ে আসতে পারি এবং যথা সময়ে কংসকে
সিংহাসনচ্যুত করতে পারি।"
-"হে বসুদেব, আমি আপনাকে সমস্ত কার্যকারণ বলবো, কিন্তু আপনি এই কাজ করতে প্রস্তুত কিনা
বলুন।"
সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। বর্ষাকাল সমাপ্তপ্রায়।
যমুনা নদী কূলে কূলে পরিপূর্ণ । রাখাল বালকেরা
গরু নিয়ে ঘরে ফিরছে। চারিদিকে এক
অপূর্ব গোধূলির সৃষ্টি হয়েছে। । বসুদেব চুপ করে রইলেন।
এই সময়ে নন্দ বলে
উঠলেন,
"মুনিবর, এই কাজের জন্য আপনি বসুদেবকেই কেন নির্বাচিত
করছেন ? বসুদেব রাজি না হলে আমাকে এই কাজ করতে অনুমতি
দিন। "
-"তা হয়না নন্দ।
আপনাকে অন্য কাজটিরই দায়িত্ব নিতে হবে, যা বসুদেব পারবেন
না। কিছুদিন পরেই কংসের ভগিনীর সাথে বসুদেবের বিবাহ স্থির হয়েছে। এই ভোজরাজ্যের
প্রজাগণ বসুদেবের সন্তান কে ভবিষ্যতের রাজা হিসাবে যত সহজে মেনে নিতে পারবে, ততো সহজে আপনার কোনো সন্তান কে মানতে পারবে না।
সাধারণ প্রজারা রাজার রক্ত বা রাজার বংশ কে বেশি শ্রদ্ধা করেন।"
বসুদেব এতক্ষন ধরে চিন্তামগ্ন ছিলেন। এবার মুখ
খুললেন।
-"হে মুনিবর, আমি এই কাজ করতে
করতে প্রস্তুত। কিন্তু আপনি আমাকে একটু বিস্তারিত ভাবে এর কার্যকারণ সম্পর্কে
বলবেন কি?"
-"শুনুন তাহলে। হে নন্দ, আপনি তো আপনার গ্রামের নির্বাচিত প্রধান। কিন্তু আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন
কি, আপনার গ্রামের কোনো প্রজাই কংসকে রাজা হিসাবে দেখতে চাননা ? “
-" না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।"
-"রাজ্যের সমস্ত প্রজা একত্র ভাবে না চাইলে আপনাদের
পক্ষে এতবড়ো কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। কংসর মতো রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য
প্রজাদের সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। সমস্ত প্রজাদেরকে
কংসর বিরুদ্ধে একত্রিত করার জন্য একটাই উপায়, কংসের অত্যাচার ও
রাক্ষসোচিত আচরণ কে আরো প্রত্যক্ষ ভাবে জনসমক্ষে আনা । এইজন্য কংসের হাত
দিয়ে আমি একাধিক অমানবিক হত্যা করাবার
পরিকল্পনা করেছি। তার হাত দিয়ে সাতটি শিশুহত্যা করানো এর একটি উপায় মাত্র। প্রথমেই রাজ্যের মধ্যে একটি বার্তা প্রচার করা হবে যে
ভগবান বিষ্ণু এক মানব জন্ম গ্রহণ করে কংসকে ধ্বংস করতে আসবেন। আমি নিশ্চিত, এই বার্তা প্রচারিত হলেই অনেক প্রজা এই ভবিষ্যৎবাণী কে ত্বরান্বিত করার জন্য
সচেষ্ট হবেন। যদিও আমি নিশ্চিত নই, এই পরিস্থিতিতে
কংস কি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে কংসের সাথে দেখা করে তার মনে
প্রচন্ড ভয়ের সঞ্চার করবো। তাকে জানাবো যে ভগবান বিষ্ণু দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্ম
নেবেন, এবং তিনিই কংসের ধ্বংসের কারণ হবেন।কংস হল
মূর্খ এবং অহংকারী ব্যক্তি। সে
কুসংস্কারগ্রস্ত এবং অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাসী। সে আমার কথা বিশ্বাস না করলেও চেষ্টা
করবে যাতে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান জন্ম না নেয়, বা তাকে জন্মের
সাথে সাথে হত্যা করা যায়। আমার পরামর্শে কংস নিজেই নিজেকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। অন্যান্য
বাকি সমন্বয়ের কাজ আমি করবো।“
---------------------------ooooooooooooooo--------------------------
রাজসভায় সাজো সাজো রব। দেবতাদের প্রতিনিধি নারদ
আসছেন কংসের সাথে দেখা করতে। দেবতাদের প্রতিনিধি বলে কথা, সমস্ত রাজাই চান তাঁকে সন্তুষ্ট রাখতে। নারদ মুনিরা বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করার
ফলে গল্পকথাতেও যথেষ্ট পটু। যেকোনো রাজসভা তাঁদের
আগমনে জমজমাট হয়ে ওঠে।
যথাযোগ্য সম্মানের সাথে নারদ কে রাজসভায় স্বাগত
জানানো হলো । নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য তাঁকে প্রদান করা হলো ।এইভাবে তাঁর পূজা সমাপ্ত হওয়ার পরে কংস বললেন, " আমার প্রণাম
স্বীকার করবেন দেবর্ষি। বলুন, দেবলোকের কোন বার্তা প্রদানের জন্য আপনার আগমন? এই রাজসভার সবাই আপনার মুখে বিভিন্ন রাজ্যের খবরাখবর জানার জন্যও
উদগ্রীব।"
-"মহারাজ, আমি আপনার সেবায়
অত্যন্ত তুষ্ট হয়েছি। আমি আপনার হিতাকাঙ্খী। এইজন্য দেবলোক থেকে একটি বিশেষ বার্তা
আমি বহন করে এনেছি। আপনি নিশ্চই জানেন যে আর্যাবর্তের সমস্ত রাজ্যগুলির ধর্ম, সংস্কৃতি ও ন্যায় রক্ষার জন্য দেবতারা সদাই তৎপর। ধর্ম ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে
রাজা, প্রজা সকলকেই সমাজ নির্মিত কিছু নিয়ম, নীতি মেনে চলতে হয়। এই নিয়ম,
নীতি বা ধর্ম মেনে না
চললে রাজা, প্রজা সকলেই ধ্বংসের পথে অগ্রসর হন। কোনো রাজা অধার্মিক হলে, দেবতারাও তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন, কারণ তাঁরা চান
না তাঁদের সৃষ্টি করা এই রাজ্য ও জনপদগুলির
কোনো ক্ষতি হোক।“
"কিছুদিন আগে
দৈবক্রমে আমি প্রজাপতি ব্রহ্মার আহ্বান করা একটি বিশেষ আলোচনা সভায় উপস্থিত
হয়েছিলাম। সেখানে শুনলাম আপনার রাজ্যে আপনার প্রজারা নাকি উৎপীড়িত ও প্রতারিত।
আপনি নিজের পিতাকে কারারুদ্ধ করে সিংহাসন দখল করেছেন। আপনার অকল্পনীয় অধার্মীকতা ও
নিষ্ঠুরতার জন্য প্রজারা সর্বদাই ভীত।"
রাজসভার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠলো। এই কথা শুনে
কংস মনে মনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেও, রাজসভায় বসে তিনি
এই কথার সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারলেন না।
শুধু বললেন, " এ আপনি কি বলছেন
দেবর্ষী ?"
-"মহারাজ, আমি যা শুনলাম তাই আপনার কাছে বর্ণনা করছি
মাত্র। আপনার অত্যাচারের প্রতিবিধান করার জন্য দেবতারা আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করে
হত্যা করার পরিকল্পনা করেছেন। ভগবান বিষ্ণু আপনাকে ধ্বংস করার জন্য দেবকীর অষ্টম
গর্ভে জন্ম নেবেন। তিনি যথাসময়ে আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করে হত্যা করবেন।“
কংস অট্টহাস্য করে বললেন, "হে দেবর্ষি নারদ, আমি আপনার কথা
বিশ্বাস করিনা। দেবতারা যতই আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করুন না কেন, তাঁদের কে আমি ভয় পাইনা। ঠিক আছে, আমিও দেখবো দেবকীর অষ্টম সন্তান বাঁচে কি
করে।"
নারদ আর কিছু না বলে সেখান থেকে প্রস্থান
করলেন। যদিও তিনি নগর পরিত্যাগ করলেন না। নগরের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও
সাধারণ প্রজাদের মধ্যে কংসের বিরুদ্ধে তাঁর প্রচার চলতে থাকলো।কংস মুখে যাই বলুক না কেন, সে সত্যিই ভয় পেয়েছে কিনা সে ব্যাপারে
নিশ্চিত হওয়া গেলো না।
------------------------------------------ooooooooooooo-----------------------------------
রাজপ্রাসাদ থেকে শঙ্খনাদ ও বিবিধ
বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে চারিদিক মুখরিত। কংসের ভগিনী দেবকীর সাথে বসুদেবের বিবাহ
সুসম্পন্ন হয়েছে। মথুরা নগরীর সকলেই আজ রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রিত। নানাবিধ আমোদ
আহ্লাদ চলছে। কংসের মন একটু
বিচলিত হলেও, তাঁর মুখাবয়বে তার কোনো ছাপ নেই। রাজসভায় সবার
সামনে নারদ এতো কথা বললেও কংস কোনোরূপ ভয় বা রাগ প্রকাশ করতে পারেন নি। তবে একটা ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। দেবকীর অষ্টম
গর্ভের সন্তান কে জন্ম নিতে দেওয়া যাবেনা কিছুতেই। কিন্তু ঘটনা একটু অন্যদিকে
গড়ালো।
কংস ঠিক করেছিলেন তিনি নিজে সারথি হয়ে
দেবকীকে রথে করে বসুদেবের ঘরে নিয়ে যাবেন।
প্রজাদের সামনে দিয়ে তাঁদের রাজা নিজে রথ চালিয়ে তাঁর ভগিনীকে নিয়ে যাবেন, এর থেকে ভালো জনসংযোগের সুযোগ আর কি হতে পারে ? নিজেকে
প্রজারঞ্জক হিসাবে প্রস্তুত করার এই সুযোগ কংস ছাড়তে চাননি। কিন্তু রথ কিছুদূর
এগোতেই ভিড়ের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থেকে কিছু প্রজা আওয়াজ করে উঠলো, "কংস, তুমি শীঘ্রই
ধ্বংস হবে। দেবকীর অষ্টম সন্তান তোমাকে হত্যা করবে।"
কংস আর নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেননা। মন তো একটু বিচলিত ছিলই, কিন্তু তিনি ভাবতে পারেন নি, তাঁর রাজ্যের সাধারণ প্রজারা তাঁকে এতটা ঘৃণা করতে শুরু করেছে। কংসের কাছে এর
প্রতিবিধান একটাই ।জনসমক্ষে জানানো যে বিদ্রোহ করলে তার কি ফল হতে পারে।
কংস দেবকীর চুল মুষ্টিবদ্ধ করে চিৎকার করে উঠলেন, "এই কথা যদি সত্য হয়, তবে আমি এখনই দেবকীকে হত্যা করবো।"
এই বলে তিনি
নিজের তরবারি উন্মুক্ত করে দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন।দেবকী ভীত হয়ে ক্রন্দন
করতে শুরু করলেন এবং কংসের পায়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করলেন।
এইসময়ে বসুদেব
কংসকে নিরস্ত করার জন্য বললেন,
"মহারাজ, দয়া করে দেবকীকে হত্যা করবেন না । আমি কথা দিচ্ছি, জন্মের সাথে সাথে দেবকীর সমস্ত সন্তান কে আমি নিজে আপনার কাছে নিয়ে আসবো। আপনি
নিজের হাতে তাদেরকে হত্যা করবেন।"
বসুদেব এর
অনুরোধে তখনকার মত কংস নিরস্ত হলেন, বা প্রজাদের কে দেখাতে চাইলেন যে তিনি নিরস্ত হলেন।
পরের দিন রাজসভায় এসেই কংস বসুদেব ও দেবকীর জন্য
কিছু নির্দেশিকা জারি করলেন। তাঁদের কে কিছু প্রহরীর দ্বারা সবসময়ের জন্য নজরবন্দি
করে রাখা হলো। তাদের নির্দেশ দেওয়া হলো দেবকী ও বসুদেবের সমস্ত গতিবিধির ওপর নজর
রাখতে। সাথে সাথে বিশেষ ভাবে এই নির্দেশ ও দেওয়া হলো যে তাদের ঘোরাফেরার ওপর কোনো
বাধা যেন সৃষ্টি করা না হয়, যাতে দেবকী ভয় পেয়ে যায়।
যথাসময়ে তাঁদের প্রথম সন্তানের জন্ম হলো।
বসুদেব নিজের কথা অনুযায়ী তাঁর প্রথম পুত্র কে কংসের সভায় নিয়ে গেলেন। প্রায় এক
বছর অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে কংস এই ব্যাপারে চিন্তা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এই সময়ে
তাঁর শ্বশুরমহাশয় জরাসন্ধের নেতৃত্ত্বে মগধ সাম্রাজ্য অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠায়
কংসের মৃত্যুভয় অনেকটাই কমে গিয়েছিলো। এখন নতুন করে সবকিছু মনে পড়ে গেলো। কিন্তু
রাজসভার মধ্যে কংস বসুদেবকে প্রশংসা করলেন তাঁর সততার জন্য। বসুদেব কে বললেন এই
সন্তান তুমি তোমার কাছেই রেখে দাও। আমি শুধু তোমার অষ্টম সন্তান কেই চাই। বসুদেব
খুশি হয়ে তাঁর পুত্রকে ঘরে নিয়ে গিয়ে মনের সুখে তাকে মানুষ করতে শুরু করলেন।
চলাফেরায় কোনো বাধা না থাকায় বসুদেব নিয়মিত
তাঁর বন্ধু নন্দর কাছে অবস্থানরত তাঁর প্রথম স্ত্রী রোহিণীর সাথেও মিলিত হতে যেতেন। বসুদেবের দ্বিতীয় বিবাহ হওয়ার
পর রোহিনী আর বসুদেবের কাছে আসতে চাননি। এছাড়া কংসের ভয় তো ছিলই। যাইহোক, কালক্রমে বসুদেব আরো পাঁচটি সন্তানের পিতা হলেন। প্রত্যেকবারই বসুদেব তাঁর
সন্তান কে কংসের কাছে নিয়ে গেলেন এবং প্রত্যেকবারই কংস তাঁকে সন্তান সমেত ফিরিয়ে
দিলেন।
এবারে নারদ প্রমাদ গুনলেন। তিনি যা আশা
করেছিলেন তা ঘটছেনা। কংসের নিষ্ঠুরতা কে জনসমক্ষে আনতেই হবে।
---------------------------oooooooooooooooooo---------------------------
-" আসুন আসুন দেবর্ষি, আসন গ্রহণ করুন। বলুন আপনার কি সেবা করতে পারি।
-"মহারাজ, আপনি জানেন আমি আপনার শুভানুধ্যায়ী।আজ থেকে
প্রায় সাত বছর আগে আমি আপনাকে একটি ব্যাপারে অবহিত করেছিলাম, আপনার মনে আছে কি ? "
-"কেন থাকবেনা ? দেবকীর অষ্টম সন্তান আমাকে হত্যা করবে , তাই তো ? "
-"আপনার ব্যবহারে
তো তা মনে হচ্ছেনা মহারাজ। আপনি বসুদেবের ছয়টি সন্তান কেই জীবিত রেখেছেন!"
-"তাতে কি হয়েছে ? আমাকে হত্যা করবে তো অষ্টম সন্তান, তাই না ? অষ্টম সন্তান কে
পৃথিবী তে আসতে দিন।"
-"হে মহারাজ, আমি আপনাকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে জানতাম ।
কখনো ভেবে দেখেছেন কি অষ্টম সন্তান মানে কি ? প্রথম থেকে অষ্টম
না কি শেষ থেকে অষ্টম ? কথায় বলে শত্রুর শেষ রাখতে নেই। আর আপনি ছয়
ছয়টি শত্রু জীবিত রেখে দিলেন ? "
নারদ কংসকে বিভিন্ন কথায় অবশেষে প্রত্যয় করাতে
সমর্থ হলেন যে দেবকীর একটিও সন্তান কংসের পক্ষে নিরাপদ নয়। কংস আর দেরি করলেন না।
বসুদেবের ছয়টি সন্তানকে একে একে তিনি জনসমক্ষে হত্যা করলেন। হত্যার আগেই কিছু
বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষ কে কংসের সৈনিকগণ তাড়না করে বদ্ধভূমির কাছে
একত্র করেছিলেন। জনসমক্ষে হত্যা করার কারন, জনগণের মধ্যে
একটি ত্রাসের সঞ্চার করা, যাতে কংসকে হত্যা করা তো দূর, তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতেও লোকে ভীত হবে। কিন্তু হলো বিপরীত ফল। কংসের অত্যাচার
এতটাই মাত্রাছাড়া হয়ে গিয়েছিলো যে ভোজরাজ্যের প্রজারা আর কংসের প্রতি ন্যূনতম
ভক্তিও মনে পোষণ করতো না। অবশেষে নারদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো।
---------------------------------oooooooooooooooooooooooooooo----------------------------
বসুদেব দ্বিতীয় বিবাহ করার কথা ভেবেছিলেন
নারদের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার কিছু আগে। প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে কোনো সন্তান
না আসায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নারদের পরিকল্পনা যাই হোক না কেন বর্তমানে
বসুদেব অন্তত একটি সন্তানের জন্য বিশেষ কাতর হয়ে পড়েছিলেন। দেবকীর গর্ভের আর একটিও
সন্তান জীবিত থাকবে কিনা সেই বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ হতে পারছিলেননা। তিনি মনে মনে
চাইছিলেন রোহিণীর কোনো সন্তান হলে এই চিন্তা থেকে মুক্ত হবেন। হয়তো ভগবান তাঁর
প্রার্থনা শুনলেন। দেবকী তাঁর সপ্তম সন্তানকে হারালেন হঠাৎ করে গর্ভপাত হওয়ার ফলে।
কিন্তু একই সময়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে খবর এলো রোহিনী সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। নারদের সুকৌশলে মথুরা নগরী তে এই বার্তাও
প্রচারিত হয়ে গেলো যে দেবকীর গর্ভ কে ভগবান বিষ্ণু নিজে রোহিণীর গর্ভে
স্থানান্তরিত করেছেন। বসুদেব এই খবর শুনে
আনন্দিত হলেও, বার বার তাঁর মন বিচলিত হচ্ছিলো এই ভেবে যে এই খবর কংসের কানে গেলে কি হবে। ফলস্বরূপ
রোহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হলো বেশি জনসমক্ষে না আসতে।
যথাসময়ে রোহিনী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন।
ভাগ্যক্রমে কংস এই জন্ম কে কোনো গুরুত্ব দিলেন না। কংসের ভীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল
দেবকীর সন্তান। বসুদেবের অন্য কোনো সন্তান নয়। বসুদেব ভাবলেন, তাঁর অষ্টম সন্তান কে যদি হত্যাও করা হয়, তাহলেও তাঁর এক
সন্তান জীবিত থাকবে।
-------------------------------------oooooooooooooooooooooo------------------------------------------
বসুদেব, নন্দ ও নারদের
পরিকল্পনার শেষ পর্যায় উপস্থিত। বৈদ্যর পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক দিনে সঠিক ওষধি
ব্যবহার করার ফলে ও সঠিক সময়ে মিলিত হওয়ার ফলে নন্দর স্ত্রী যশোদা এবং বসুদেবের
স্ত্রী দেবকী একই সময়ে গর্ভধারণ করলেন। বৈদ্য মহাশয়ের গণনা সঠিক হলে যশোদা এবং
দেবকীর সন্তানের জন্মের সময়ের মধ্যে দুই দিনের বেশি তফাৎ থাকবেনা। নারদের অন্য
পরিকল্পনাও সর্বতোভাবে সফল হয়েছে। ভোজ রাজ্যে কংসকে সমর্থন করার মতো আর কেউ নেই। মথুরা
নগরীর আশেপাশে কান পাতলে শোনা যাবে,
সকলেই অপেক্ষা করছেন কবে দেবকীর অষ্টম সন্তান জন্ম নেবে ও ভবিষ্যতে
কংসকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে হত্যা করবে। কংসের প্রহরী, সেনা কেউই এই ধারণার থেকে মুক্ত নয়।
বরং তারা কিছুটা বেশিভাবেই কংসের ধ্বংস চায় এই কারণে যে , তাদের হাত দিয়েই কংস যত রাজনৈতিক হত্যালীলা ও প্রজা উৎপীড়ণ সম্পন্ন
করেন। পাপের ভয় বা বিবেকবোধ দুটোই তাদেরকে কংসের
বিরোধিতায় অবতীর্ণ করে দিয়েছে।।এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
---------------------------ooooooooooooooooooooooo---------------------------------------
প্রচন্ড ঝড় জলের রাত। সারা মথুরা নগরী
অন্ধকারে নিমগ্ন। এইরকম প্রলয়ংকর বর্ষা এখানে মাঝে মাঝে হলেও আজ যেন একটু বেশিই
হচ্ছে। কংস জানেন আজ দেবকীর সন্তান জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি ভেবেছিলেন
জন্মের সাথে সাথেই তিনি নিজে গিয়ে এই শিশুটিকে দেবকীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা
করবেন। কিন্তু বাধ সাধলো বৃষ্টি। এইরকম আবহাওয়ায়
নিজের ঘরে বসে সুরাপানকেই কংস অগ্রাধিকার
দিলেন। কংস তাঁর পরিকল্পনা পরিবর্তন করলেন। একটি সাধারণ শিশুকে হত্যা করার জন্য
কাল সকালে গেলেও চলবে।
প্রায় মধ্যরাত সমাগত। বাইরের বৃষ্টি কিছুটা স্তব্ধ হয়েছে, যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে কিছু ঘটনা ঘটার। আকাশ কিছুক্ষনের জন্য পরিষ্কার
হয়ে উঠে কৃষ্ণা অষ্টমীর চাঁদকে অনুমতি দিয়েছে পৃথিবী কে আলোকিত করার । রাতফুলের
গন্ধ মেখে নিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে চলেছে। আকাশে রোহিনী নক্ষত্র জাজ্জ্যল্যমান হয়ে
বিরাজমান। দেবকীর গর্ভ থেকে জন্ম নিলেন এক মহামানব, ভবিষ্যতে যিনি
সকলের কাছে কৃষ্ণ নামে পরিচিত হবেন। কৃষ্ণের আগমনে সারা কুটির যেন আলোকিত হয়ে
উঠলো। নারদের অনুরোধে কিছু দেবতাও এই সময়ে
উপস্থিত হলেন, নবজাতক কে আশীর্বাদ করার জন্য। দেবতাদের দেখে
বসুদেব এক বিরাট মানসিক শান্তি পেলেন। তাঁর এতদিনের ধৈর্য ও ত্যাগ আজ সার্থক। যত
আঘাতই আসুক না কেন, দেবতাদের তিনি পাশে পাবেন। তাঁর এই সন্তানের
কোনো ক্ষতি কংস করতে পারবেননা । যেসব প্রহরী
এতদিন দেবকী ও বসুদেবকে নজরবন্দী করে রেখেছিলো, তাদের বেশিরভাগই
নিদ্রারত।যারা জেগে ছিল, তারাও নবজাতকের আগমনে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো ।
হঠাৎ যমুনার ধার থেকে দুই প্রহরী দৌড়াতে দৌড়াতে
দেবকীর প্রসব কুটিরের কাছে এসে উপস্থিত হল।
দরজায় করাঘাত, "বসুদেব, বসুদেব"। ধাত্রীগন এতক্ষন সদ্যোজাত শিশুটিকে পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন।
করাঘাত শুনে বসুদেব এবং ধাত্রীগণের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। শেষ, সব শেষ। কিন্তু সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। বসুদেব দরজা খুললেন। কিন্তু এ তো দুজন
প্রহরী মাত্র, কংস কই ?
"হে বসুদেব, আপনি আর দেরি করবেননা। আমরা সকলে আপনাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত । নন্দ মহাশয়ের কথা মতো নাগ জনজাতির প্রতিনিধিগণ
তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কুশল নৌকাচালক,
"শেষনাগ" কে আপনাকে সাহায্য করতে
পাঠিয়েছেন। শেষনাগ নিজে একটি বিশেষ নৌকা প্রস্তুত করে আপনার জন্য এনেছেন।আপনি এই
নৌকায় যমুনা পার করে শিশুটিকে গোকুলে নন্দের বাড়িতে রেখে আসুন। আমরা খবর পেয়েছি
তাঁর স্ত্রী যশোদাও আজ একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আপনাদের পরিকল্পনা মতো
নন্দ তাঁর কন্যাসন্তান কে আপনার হাতে তুলে দেবেন এবং আপনার সন্তান কে গ্রহণ করবেন। যশোদা কে বিশেষ ওষধীর দ্বারা ঘুম পাড়িয়ে রাখা
হয়েছে।তিনি তাঁর সন্তান কে এখনো দেখেননি।দয়া করে আর দেরি করবেননা। এমন কি যমুনার ধারে বসবাসকারী কংসের
বন্ধুস্থানীয় নাগপ্রধান কালীয়নাগ, যিনি তাঁর এলাকার সামনে দিয়ে যমুনা পার করার জন্য সবসময় বাধার সৃষ্টি করেন, তিনিও আপনাকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন। তিনি ইদানিং কংসের ওপর বিভিন্ন কারণে
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ । এই সুযোগ হারাবেননা বসুদেব !!"
বসুদেব আর দেরি করলেননা।প্রসবের সময় দেবকী
সংজ্ঞা হারিয়েছিলেন, এখনো তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।একটি ঝুড়ির মধ্যে
বস্ত্রের দ্বারা শিশুটিকে ঢেকে তিনি প্রস্তুত হলেন। ঘরের বাইরেই ছাতা নিয়ে শেষনাগ
অপেক্ষা করছিলেন। বসুদেবের ওপর ছাতা ধরে তিনি তাঁর নৌকা পর্যন্ত বসুদেবকে নিয়ে
গেলেন। শেষনাগের দক্ষ নৌকাচালনা দেখে মনে হচ্ছিলো যেন যমুনা নদী নিজে দুপাশে সরে
গিয়ে তাঁদেরকে পথ করে দিচ্ছে। গোকুলে পৌঁছনোর পরে আবার শেষনাগ ছাতা ধরে বসুদেব এবং
শিশুটিকে বৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত করে নন্দের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
নন্দ প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। নিজের
কন্যাসন্তানটিকে তিনি বসুদেবের হাতে অর্পণ করলেন ও বসুদেবের পুত্রকে গ্রহণ করলেন।
ক্ষনিকের জন্য নন্দের মনে হলো, কন্যাসন্তান দেখে হয়তো কংস তাকে হত্যা নাও করতে
পারেন। একই কথা বসুদেবেরও মনে হয়েছিল, কিন্তু কেউ ই এ
নিয়ে আর কোনো বাক্যব্যয় করলেননা। শেষনাগ আবার বসুদেবকে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিয়ে এলেন। দেবকী বা যশোদা কেউই জানতে পারলেননা যে তাঁদের
সন্তান পরিবর্তন হয়ে গেলো।
-------------------------------------ooooooooooooooooo-----------------------------------------
পরের দিন সকাল। মহারাজ কংস দেবকীর কাছ থেকে
তাঁর কন্যাসন্তানটিকে ছিনিয়ে নিয়ে এলেন। কন্যাসন্তানের দোহাই দিয়ে দেবকী অনেক
কাকুতি মিনতি করলেও কংসের মন গলাতে পারলেননা। আবার জনসমক্ষে একটি শিশুহত্যা সংঘটিত
হতে চলেছে। কংস মনে করলেন দেবকীর এই অষ্টম সন্তান কে হত্যা করার পর তাঁকে হত্যা
করার মতো এই পৃথিবী তে কেউ থাকবে না । কংস শিশুটিকে প্রস্তরে আঘাত করে হত্যা করার
সাথে সাথে জনগণের মধ্যে হাহাকার উঠলো। কিছু ব্যক্তি শিশু পরিবর্তনের কথা আগেই
জানতে পেরেছিলেন। তাঁরা অন্য ব্যক্তিদের অভয় দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন
"কংসকে যিনি হত্যা করবেন, তিনি গোকুলে বড় হচ্ছেন। আপনারা নিশ্চিন্ত
থাকুন।"
এইবারে কংসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর চাপা থাকলোনা
। কংস নিজেও ভাবতে পারেননি প্রজারা এইভাবে প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ
করবে । তিনি কিছুটা ভীতও হয়ে পড়লেন। অন্তত এই কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেলো যে আর সরাসরি
নয়, এবারে বিভিন্ন ছল চাতুরির দ্বারা দেবকীর ওই
অষ্টম সন্তান কে হত্যা করতে হবে। কিন্তু সে তো পরে হবে !!
বর্তমানে এটাই সত্যি যে এমন একজনের জন্ম হলো, যিনি আর্যদের বহু প্রচলিত ধ্যান ধারণা, নীতি নৈতিকতার
সংজ্ঞা কেই পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখবেন । যিনি আর্যদের কিছু নিরর্থক অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিপূজার আড়ম্বর, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে, তাকে নস্যাৎ করে
সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন আঞ্চলিক বা লোকদেবতার পুজো করার প্রথা কে স্বীকৃতি দেবেন। কৃষ্ণের নেতৃত্ব ও পরিচালনা করার ক্ষমতায় পাণ্ডবরা যুদ্ধজয়ী হবেন । কৃষ্ণের বাণী যুগে যুগে সাধারণ মানুষ কে অনুপ্রেরণা
দেবে এবং তাঁর দেখানো পথে চলে মানুষ সমাজের জন্য, নিজের জন্য তাদের
জীবন কে সম্পূর্ণ ভাবে সদ্ব্যাবহার করতে পারবেন। ভবিষ্যতে জনগণের মনে ভগবানের স্থান পাওয়া এই মহান ব্যক্তি ভারতবর্ষের
বিভিন্ন মানুষের মধ্যে
একাধারে আদর্শ বন্ধু বা প্রেমিক , আদর্শ দার্শনিক এবং আদর্শ রাজা বা পথনির্দেশক , তিন রকম ভূমিকাতেই পূজিত হবেন।এমন কি তাঁর শিশু রূপ কেও আদর্শ শিশু হিসাবে পূজন করা হবে। এই মহাত্মার বাকি
জীবনের গল্প আরেক দিন বলা যাবে।
----------------------------------ooooooooooooo-------------------------------------------
Excellent!!
ReplyDelete