Story-Interview

ইন্টারভিউ

সুব্রত ভট্টাচার্য

ট্রেন আছে দুটো কুড়ি তে।  ইন্টারভিউ দিয়ে যখন স্টেশন এ পৌঁছালাম তখন দুপুর দুটো।  একটু একটু বৃষ্টি পড়ছে I স্টেশন এর নামটা অদ্ভত। কাহ্নে। মারাঠি তে কাহ্নে কথাটার মানে কি কে জানে। ভারতের সমস্ত গ্রামের নামের মানে বোধহয় হয় না। স্টেশন এর চেহারাটাও অন্যান্য সাধারণ গ্রামের মতন। দুটো কুকুর অলস ভাবে শুয়ে আছে। বাউন্ডারির কোনো বালাই নেই। দুজন বয়স্ক লোক প্লাটফর্ম এর ওপরেই বসে গল্প করছে। পরনে সাদা পাজামা, সাদা ফতুয়া আর মাথায় সাদা গান্ধী টুপি --- মহারাষ্ট্রের গ্রামের সাধারণ মানুষের পোশাক। 
মনটা খুব হালকা হয়ে ছিল ----“না” বলতে পারার আনন্দে। মাথাতে ঘুরছিল বর্তমান বস এর দেওয়া কিছু অতিরিক্ত দায়িত্বের কথা। 
OOOOOOOOOO
- " কত দিনের অভিজ্ঞতা ? "
- " আট বছর "
- " মারাঠি বলতে পারেন? "
- " না তবে বুঝতে পারি "
মারাঠি বুঝতে পারা টা পুনেতে পাঁচ বছর থাকার ফল। কথা বার্তা হিন্দিতেই হচ্ছিল। এখানে কারখানা গুলি তে ইংরেজি বেশি চলেনা বা বলার মতো লোক নেই - অন্তত উৎপাদন  এর সাথে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তি দের মধ্যে। 
প্রশ্ন টা অদ্ভত। কারণ আমার বর্তমান সংস্থায় থেকে একথা কখনো মনে হয়নি যে মারাঠি বলা টা আবশ্যিক। 
- " বায়োডাটা তে ম্যাট্রিক এর উল্লেখ করেননি কেন ? "
এই প্রশ্ন টাও বিরক্তিকর। আট বছর অভিজ্ঞতার পরে বায়োডাটা তে ম্যাট্রিক এর উল্লেখ করার কোনো মানে হয়না। বেশির ভাগ আলোচনা বর্তমান কাজের বিস্তৃত বিবরণ বা তার আগের অভিজ্ঞতার বিবরণেই কেন্দ্রীভূত থাকে - যেটা আমার বায়োডাটা তে ছিল। শিক্ষাগত যোগ্যতায় শুধু ডিপ্লোমা ইন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং লেখা ছিল। অন্য কোথাও এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি।
- " আমার মনে হয় আট বছর অভিজ্ঞতার পরে এর উল্লেখের কোনো প্রয়োজন নেই। "
- " না উল্লেখ করা উচিত ছিল। "
আর সহ্য করা গেলনা। 
- " আপনি কি সদ্য পাস করা লোক খুঁজছেন ?"
- " না আমি এমন একজন চাইছি যে আমাদের কারখানার এই অংশের উৎপাদন  একলা সামলাতে পারবে। 
আচ্ছা আপনি কি রকম কারখানায় কাজ করেন ? "
- " আমি যেখানে কাজ করি সেখানে তিন শিফট এর সুপারভাইসর আমাকে রিপোর্ট করে।  কম্পিউটার চালিত যত মেশিন আছে তার প্রোগ্রামিং এবং সেটিং এর কাজ জানি।  "
-" নিজের হাতে সাধারণ লেদ বা মিলিং মেশিন চালাতে পারেন ? "
- " পারি তবে কখনো দরকার পড়েনি। মেশিন অপারেটর কে পদ্ধতিগত শিক্ষা দিতে পারব। "
- " আপনি নিজে চালাননা মানে আপনার এই ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। "
হাসি পেল। সরাসরি অনভিজ্ঞ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা। কেন ? বেতন এর ব্যাপারে ভালো দর কষাকষি করা ?এই পাঁচ বছরে অনেক ইন্টারভিউ দেওয়ার ফলে উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধে হলনা।
- " দেখুন আপনাদের বিজ্ঞাপন এর কথা যদি সত্য বলে ধরি , তাহলে আপনার একজন অপারেটর নয় ম্যানেজার চাই। তাকে নিজের হাতে মেশিন চালাতে হবে না। প্রধান কাজ থাকবে পরিকল্পনা করার এবং থাকবে কিছু যন্ত্র ভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও শ্রমিক দের থেকে কাজ নেওয়ার ক্ষমতা। "
এত কথা বলে নিজের ই আশ্চর্য লাগলো।এত আত্মবিশ্বাস এলো কথা থেকে ? interviewer এর মুখে মুখে কথা বলা ? কলকাতায় থাকলে ভাবতে পারতাম ?
OOOOOOOOOO
হঠাত একটা গলার আওয়াজ। মারাঠি তে প্রশ্ন। কটা বাজে ? লোকটাকে উত্তর দিতে গিয়ে চোখ চলে গেল ব্ল্যাক বোর্ড এ। দেবনাগরী তে লেখা আছে " - ২০ চি লোনাভলা পুনে লোকাল রদ্দ কেলে আহে। মুশকিল হলো। যদিও পুনে থেকে দুরত্ব বেশি নয় , কিন্তু লোকাল ট্রেন খুব কম। পরের ট্রেন সেই ৩-২০ তে। এর মানে এখনো এক ঘন্টা এখানে বসে থাকতে হবে। বাস ধরার জন্য যাওয়া যায়, তবে অনেকটা হাঁটতে হবে। বৃষ্টিটা এখনো থামার নাম করছেনা। পুনে তে বর্ষা টা খুব বেশি। প্রায় দীপাবলী পর্যন্ত চলে। বাকি সময় খুব ভালো আবহাওয়া। গরম বা ঠান্ডা কোনোটাই বেশি নেই।  একটাই জিনিস বেশি, তা হলো কাজ করার সুযোগ। 
OOOOOOOOOO
মাত্র সাত মাস হয়েছিল কলকাতার সেই কারখানায়। জামশেদপুরের একটি ছোট কারখানার চাকরি ছেড়ে কলকাতায় একটি কারখানায় কাজ নিয়ে চলে এসেছিলাম। উদ্দেশ্য একটাই , বর্ধমানে নিজের বাড়ির কাছে একটি কাজ যোগাড় করা - অন্তত জামশেদপুরের থেকে বেশি কাছে তো বটেই।  ইন্টারভিউ এর সুযোগ একটিই পেয়েছিলাম , " ঠিক স্যার, হাঁ স্যার" বলার ফল পেয়েছিলাম হাতে নাতে। অন্য কোনো সুযোগ না থাকার ফলে কোনো দর কষা কষি নেই , যা করতে বলবে তাই করব, যা টাকা দেবে তাই নেব। 
কাজের ক্ষেত্র কিছুটা আলাদা। কিন্তু এর মধ্যেই নানা রকম কথা কানে আসতে লাগলো। 
আমি নাকি কাজ কিছুই জানিনা। এত বেতন দিয়ে একজন অল্প বয়েসী ছেলেকে কেন রাখা হয়েছে ? এখানকার অন্যান্য কর্মী দের গড় বয়স হয়ত চল্লিশ এর উপরেই হবে। আমার প্রথম অফিস রাজনীতির অভিজ্ঞতা শুরু হলো। 
সুযোগ এর অভাবে মানুষ নিজেকে অরক্ষিত মনে করতে শুরু করে। নতুন কাউকে নিজের কাজের ক্ষেত্রে মেনে নিতে পারেনা। তখন শুরু হয় পদে পদে হেনস্থা এবং আক্রমন। মালিক শুধু নীরব দর্শক , কারণ তিনি নিজেও তাদের কে সমীহ করে চলতেন। এই আক্রমন ঠেকানোর সাধ্য আমার ছিলনা।  অতএব খালি হাতে কোনো কাজের সন্ধান ছাড়াই পুণায় আগমন এবং ৭ দিন এর মধ্যে একটি ছোট চাকরির সন্ধান। পুনেতে পা রাখার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। এর পরে আর দেখতে হয় নি। পুনে আমাকে প্রচুর কাজের সুযোগ দিয়েছে। ৫ বছরে ২ টি কাজ বদল করে এখন একটু সুস্থির হয়েছি। 
OOOOOOOOOO
- " আপনি কি বলতে চান? "
- " আমার মনে হচ্ছে আমি আপনাদের উপযুক্ত প্রার্থী নই , শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই "
- " আমি আপনার সাথে একমত "
আর দরকার নেই , আবার পরে অন্য সুযোগ পাব। আমি জানি আজ আমার কাজের অভাব নেই। 
OOOOOOOOOO
মোবাইল ফোন টা বাজছে , মুকেশ এর ফোন,
-" কি দাদা ইন্টারভিউ কেমন হলো ? "
এখানে বাঙালিদের কে দাদা বলেই ডাকা হয়। 
-" পছন্দ হলনা "
- " ঠিক আছে, তুমি ঠিক অন্য কোথাও ঠিক পেয়ে যাবে। জানো তো এখানে ৫ বছরের বেশি কোথাও কাজ করলে উন্নতি হয়না ! কাজেই খোঁজ চালু রাখো।  "
কথাটা একদম মিথ্যা নয়, কিন্তু মনে একটা শংকা থাকে, নিজের ঘর ছেড়ে, নিজের রাজ্য ছেড়ে আর কতদিন এই দৌড় চলবে ? রাজনৈতিক পরিবর্তন নয় , মানুষের কবে পরিবর্তন হবে ?
OOOOOOOOOO
ফোন এর মেসেজ টোন বেজে উঠলো , বস এর মেসেজ , " কাল দেরী করে এস , USA এর কাস্টমার এর সাথে টেলি কনফারেন্স আছে, ফিরতে দেরী হবে।"  যাক ভালই হলো, কাল সকাল সকাল ওঠার ঝামেলা নেই। 
আপাতত এখানেই থিতু। কিছু নতুন বন্ধু হয়েছে বা হবে - যারা আমাকে অনেক পথপ্রদর্শন করেছে - না না ওরা কোনো পার্টি করে না , বিভিন্ন কারখানায় কাজ করে। 

Comments

Popular posts from this blog

The story of Ganga

A Management and political lesson from the Ramayana

The revenge - প্রতিশোধ